Bengali Uncategorized

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়

FacebookTwitterGoogleLinkedIn


তখনও নটা পনেরো’র বোটটা ছাড়েনি । কোনক্রমে টিকেটটা ঘাটের হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের হাতে গুঁজে দিয়ে দৌড় লাগালাম উর্ধশ্বাসে । হেমন্ত মুখোপাধ্যায় মানে, আমি ওকে ওই নামেই মনে মনে ডাকি আর কি । উনি এই ফেরিঘাটের টিকেট কালেক্টর । আসলে হয়েছে কি , ভদ্রলোককে অবিকল হেমন্তবাবুর মতই দেখতে । ঐরকম হাইট , ব্যাকব্রাশ করা চুল, চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা আর সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট যেটা, সেটা এই ২০১৫ তেও ওঁর পরনে ধুতি শার্ট । নরুন পাড় ধুতির ওপর হাত গোটানো লম্বা ধোপাবাড়ি ফেরত বাংলা শার্ট । ওঁকে দেখছি প্রায় বছর সাতেক ঠিক এই ভাবেই । বয়েস প্রায় সত্তরের কোঠায়, কিন্তু চেহারাটা বেশ কেঠো বলেই কিনা জানিনা, শীত, গ্রীষ্ম ,বর্ষা ওই একই পোশাকে ওনাকে দেখি এবং সবমিলিয়ে সুস্থই দেখি । একদিন ফেরার পথে একটু আলাপ জমানোর ইচ্ছে হলো । টিকেটটা হাতে গুঁজে দিয়ে , বলেই ফেললাম , “ইয়ে, মানে, কাকাবাবু আপনাকে না অবিকল হেমন্তবাবুর মতই ইয়ে , মানে ….দেখতে !” ভদ্রলোক বেশ মিতবাক । আমার কথা শুনে মনে হলো না খুব একটা নতুন কিছু শুনলেন ! হয়ত অনেকেই ওকে এভাবেই রেকগনাইজ করেন । শুধু সামান্য ঘাড় নেড়ে, একটু হাসার চেষ্টা করলেন এবং চুপ করে গেলেন । কথা আর আগে বাড়ছে না দেখে, ভাবলাম , উনি বোধহয় মনে মনে বিরক্ত হলেন , তাই আর কথা বাড়ালাম না , পা বাড়ালাম ।
দিন সাতেক পর বাড়ি ফেরার সময়ে টিকেট দিয়ে বেরিয়ে আসছি হঠাত পিছন থেকে ডাকলেন উনি, একবার । জলদগম্ভীর গলাটা শুনে বেশ চমকে উঠলাম । আরে , এ তো সেই ,’আয়, খুকু আয়’ এর গলা । ঠিক সেই রকম আবেগী , পিতৃসুলভ আর অসম্ভব পুরুষালি ব্যারিটোন । আমি ফিরে তাকাতেই, খুক খুক করে একটু কেশে বললেন, ‘ সেদিন বলছিলেন না, ওই হেমন্তবাবুর সাথে আমার মিল… ইত্যাদি !’ আমি ঘাড় নেড়ে , মানে একটু বোকার মতই বললাম ,’ হ্যা , মানে’ ! এবার আমায় থামিয়ে দিয়ে, একটু থেমে থেমে উদাস হয়ে উনি বললেন, ‘ এই শহরে আসি আটাশ বছর বয়েসে , আদি বাড়ি মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান ।’ হঠাত থেমে জিগ্গেস করলেন , ‘হাতে সময় আছে তো ?’ আমি হ্যা বলতে আবার শুরু করলেন, ‘ গান গাইতাম ছোট থেকেই। পাড়ার লোকে বলত একদম হেমন্ত মুখার্জি ।’ এই অব্দি বলে, পকেট থেকে একটা নস্যির ডিবে বের করলেন ,নাকে খানিকটা নস্যি নিয়ে আবার বলতে শুরু কল্লেন ‘ হেমন্তবাবু, মান্না বাবুর তখন সাম্রাজ্য । বুইলেন । শুনে শুনে গাইতুম, গান শিখিনি তো কক্ষনো । বাপ, মা মরা ছেলে । শিকবুই বা কোতায় ! কলকাতায় এলাম আটাত্তরে । শ্যালদায় একটা বন্ধুর মেসে থাকতুম । প্রথম প্রথম তো তেমন ডাক আসতো না, অরিজিনাল হেমন্তবাবু তখন বেঁচে , কন্ঠি আর কে শোনে । এই টুকটাক ফাংশন এ গান গাওয়ার ডাক পড়ত । কতই বা রোজগার ! যা হোক , বিয়ে কল্লুম । সংসার কল্লুম ,বছর দশ ।সন্তানাদি হলো না । গিন্নি চলে গেলেন কিডনির রোগে । চিকিচ্ছে করাতে পারিনি । এরমধ্যেই উননব্বুইতে হেমন্তবাবু পরলোক গমন কল্লেন । কলকাতা তখন খাঁ খাঁ কচ্ছে, বুইলেন । জলসায় তকন আমার খুব কদর । আমিও ঠিক ঐরকম ধুতি জামা ,চশমা পড়তে শুরু কল্লুম । ওঁর যত ভালো ভালো গান , সেই সবই গাওয়ার ফরমাস আসতো । সেভাবেই চলছিল । তারপর একটা সময় বাংলা গান টান কেমন বদলে গেল । কেউ আর ত্যামন ডাকে না । নতুন নতুন সব শিল্পী এয়েছেন । সময়টা আবার পড়ে গ্যালো ।’ এই অব্দি বলে ,ভদ্রলোক, চুপ করে মাথা নিচু করে নদীর দিকে চেয়ে রইলেন খানিকক্ষণ । হঠাত জিগ্গেস করলেন,’ আপনার কাছে একটা সিগারেট হবে ?’
সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে দিলাম একটা সিগারেট । দু আঙ্গুলের ফাঁকে সিগারেটটা বেশ আয়েশ করে ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ভদ্রলোক বললেন, ” আসল আসলই হয় মশাই, নকল কক্ষনো আসল হয় না । আমি যতই ওঁর মত ধুতি, জামা পরি, টেরি কাটি না কেন, লোকে তো বুজত, এ লোকটা নকল । তাই গানগুলোও নকল । কিন্তু বিশ্বাস করুন, গান গাইতুম একদম ভেতর থেকে, চোখ বুজলেই দেকতুম, হেমন্তবাবুর আঙ্গুলগুলো হার্মনির রিড এর ওপর উটছে , পরছে । গলায় সেই কাজ করতুম …..পারলুম না । শেষে , ট্রেনে ট্রেনে কামরায় ঘুরে ঘুরে গাইতাম কিছু দিন । শরীর দিল না , বয়েস তো হলো । গলাটাও আর আগের মত জোর নেই, বুজলেন কিনা । এক পরিচিত দেখে এইখেনে চাগরি দিলেন , এখন এই কালেক্টর হয়েই দিন কাটাচ্ছি । এরা যা দেয়, কোনো ক্রমে একলার পেট চালিয়ে নি । ” খানিকক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম । গলা খাঁকরি দিয়ে উঠে পরলাম । কি বলব বুঝে উঠতে পারছিলাম না । আমার কাছে শুধু চেহারা গত সাদৃশ্য দিয়ে মনে মনে যে মজাটা করে আসছিলাম , একজনের জীবনে তার প্রভাব কতখানি সুদূরপ্রসারী, সেটা জানতে পেরে কেমন একটা চাপা কষ্ট হচ্ছিল ।
বিদায় জানিয়ে ‘আসি’ বলে ঘুরে দাঁড়াতেই উনি আরেকবার পিছু ডাকলেন । একটু ইতস্তত করে বললেন ,” আচ্ছা, আপনারা, কোনো চেনাশোনা জলসায় হেমন্ত কন্ঠি খোঁজেন না আজকাল ? লাগলে বলবেন । ওই পুজোর সময়- টময় । অল্প পয়সায় গেয়ে দোবো । চেহারাটা তো এখনো রেখিচি । আমার তো ফোন নম্বর নেই , এই টিকিট কাউন্টারে বলে দিলেই ওরা আমায় জানিয়ে দেবে ! ” জানাবো বলে সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে এলাম । ততক্ষণে পরের বোটের লোকজন চলে এসেছে । ফেরিঘাটের পাশের কালিমন্দিরের চাতালে ততক্ষণে তাস খেলুড়েদের ভিড় জমেছে । কারুর ট্রানসিস্টর রেডিও থেকে ভেসে আসছে গান ,”এ ব্যথা কি যে ব্যথা, বোঝে কি আনজনে, সজনী আমি বুঝি, মরেছি মনে মনে …..” কি মনে হলো, পিছন ফিরে দেখলাম । লম্বা,শীর্ণ, দীর্ঘদেহটা ভিড়ের সব মাথা ছাড়িয়ে দূর থেকে দেখা যাচ্ছে । আবার নিত্যযাত্রীদের কাছ থেকে একমনে মাথা নিচু করে টিকেট কালেক্ট করছেন আমার ‘হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ‘ কাকাবাবু ।

One comment

Leave a Reply


Your email address will not be published. Required fields are marked *