Uncategorized

সং অফ দি রোড ~

FacebookTwitterGoogleLinkedIn


চল্লিশের দশকের শেষে যখন সিনেমার নিজস্ব ভাষা খুঁজছেন সত্যজিৎ রায়, তখন কলকাতায় এসে তাঁকে উৎসাহিত করেন জাঁ রেনোয়া। আর সেই সিনেমা করার খাতিরেই সত্যজিত তখন খুঁজে চলেছেন এমন একটি গল্প, এমন একটি নিবিষ্ট সাহিত্যপাঠের অভিজ্ঞতা , যাকে নিয়ে ছবি বানানো যায় এবং সে ছবির প্রকাশভঙ্গিও তার সাহিত্যগুন অক্ষুন্ন রেখে একটা বিশিষ্ট শৈলীতে প্রকাশ পেতে পারে । ঠিক এমন সময়েই বিভূতিভূষণ এর ‘আম আঁটির ভেঁপু ‘ ও ‘বল্লরী বালাই’ তার হাতে আসে এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রে শুরু হয় এক যুগান্তকারী সিনেমার যাত্রা । বহু উত্থান পতনের পরে অনেকবার কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ছবিটি বিশ্ব ভ্রমন করে ও ভারতে মুক্তি পায় ১৯৫৫ সালের ২৬ সে অগাস্ট । তার পরের ইতিহাস, চলচ্চিত্র প্রেমী মাত্রেই জানা । সাদাকালোয় আবেগ এর অক্ষরে সত্যজিত সৃষ্টি করেন এমন এক কালজয়ী ছবি, যা আজও মুক্তির ৬০ বছর পরেও আমাদের ঠিক প্রথম দিনের মত, প্রথম দেখার মত আবেগ বিহ্বল করে রাখে, মোহিত করে রাখে, হৃদয়ের আতুর কাঁপনের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে , সিনেমার এই অনুপম চিত্রভাষা । শুধুমাত্রই একটি আঞ্চলিক বাংলা ছবির সামান্য পরিচয়টুকু সম্বল করে এ ছবি পৌঁছে যায় মহাবিশ্বের মানুষের কাছে, কালক্রমে হয়ে ওঠে সার্বিক ভাবে ও সফল ভাবে আন্তর্জাতিক ।

এক্ষেত্রে আজও এই ছবিকে নিয়ে আলোচনা করতে হলে যে দুজনে অবস্থান করেন এই ছবির দুপ্রান্তে , তার একজন যদি সত্যজিত হন তবে আরেকজন বিভূতিভূষণ । পথের পাঁচালির ক্ষেত্রেও তাই, বিভূতিভূষণ হীন সত্যজিতকে যেমন আলাদা করে পড়া যায় না , তেমনি সত্যজিত বিহীন বিভূতিভূষণকেও পড়বার দাবি করা যায় না । গল্প এবং চিত্রনাট্য যেমন সময়ের প্রয়োজনে নিজের নিজের অপূর্ণতাটুকু পূর্ণ করে হয়ে ওঠে একটা গোটা জীবনের সময়সারণী তেমনি এই চলছবিতে আদ্যন্ত করুন রসে সিক্ত যে রোমান্টিসিসম এর ধারণা পায় আবিশ্ব দর্শক, সে ধারণা আজও অবধি বয়ে চলে বাংলা ছবির রক্তস্রোতে। সত্যজিতও থেকে যান বাঙালির এই অবিস্মরণীয় জেনেটিক কোড হয়ে , যা কিনা বাকি বিশ্বকে শাসন করেছে, হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে , বিবেকের পাশে এনে দাঁড় করিয়েছে গত ৬০ বছর ধরে ।

পথের পাঁচালি সেই মৃত্যুহীন এলিজির নাম, যেখানে স্বপ্ন পূর্ণ হয় না কারো । তবুও স্বপ্ন দেখে যায় এ ছবির প্রতিটি চরিত্র । হরিহর এখনো স্বপ্ন দেখেন পালা বাঁধবেন, রোজগার পাতি বাড়বে, মেয়ের বিয়ে দেবেন, দূর্গা স্বপ্ন দেখে রানুদিদির মত তাঁরও একদিন বিয়ে হবে, পুন্যিপুকুর ব্রতগানে দূর্গা ভিজিয়ে রাখে তার স্বপ্ন, অপু এখনো কলকাতার বুকে বসে বভ্রুবাহন পালা লেখার স্বপ্ন দেখে যায় আর সর্বজয়া মনসাপোতার একলা বাড়ির দাওয়ায় বসে স্বপ্ন দেখে অপু ফিরে আসবে , আসবেই একদিন । আর ইন্দির… তিনি স্বপ্ন দেখেন তাঁর আজীবনের শুন্যতার শেষেও নিজের একটা সংসার থাকবে, থাকবে একটুকরো মাটির দাওয়া আর খোকাখুকুর হাসি । একমাত্র সারল্য আর নিপাট সততাই পারে এমন কোনো সৃষ্টি সম্পূর্ণ করতে , যা কালক্রমে ক্ষয় হয় না , বরং তার জীবন বোধ আরও আরও ঋজু হয়ে ভবিষ্যতের মানুষকে ভাবিত করে । পথের পাঁচালির মূলকথাই বোধহয় সেই অমলিন সারল্য আর জীবনের চলমান উপকথা, যে কথা শেষ পর্যন্ত মানুষের । পাওয়ার, না পাওয়ার, অতৃপ্তির, ক্লান্তির, শ্রমের, মৃত্যুর কথা । যে কথা ইন্দির ঠাকরুনের গানের মত ধ্রুব ও অবশ্যম্ভাবী । রাত্রির অন্ধকারের দেওয়ালে লম্ফের কাঁপা কাঁপা আলো জ্বলা অনিশ্চয়তায় তাই সে গান ঘুরে ঘুরে আসে মৃত্যুর সারেং হয়ে , ‘হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যে হলো, পার করো আমারে ‘ ।

One comment

Leave a Reply


Your email address will not be published. Required fields are marked *