Bengali Uncategorized

শীতলপাটি ও অঘ্রানের গল্প

FacebookTwitterGoogleLinkedIn


কিছু কিছু কিসসা কোনদিন ফুরায় না , কিছু কিছু শীতকাল ও । তামাম ছোট বেলা থেকে দৈর্ঘে প্রস্থে বড় হয়ে ওঠাটার গায়ে গায়ে যে দ্বিতীয় ত্বকের মত স্নেহরং বোরোলিন লাগিয়ে দিত মা , জীবনের ওঠা পড়া যাতে সহজে গায়ে না লাগে।সেই বোরোলিন এখনো গায়ে লেগে আছে, অনভ্যস্ত চামড়ায় । অথচ জীবনের সব ওঠা পরা, ছেঁড়া কনুই এর চোট, পায়ের পাতার নিচে আড়াআড়ি কাটা, স্মৃতি সবই গায়ে লেগে গেছে নির্ভুল । ঠিক সেই ছিয়াশি সালের মত বছর সাত আটের আঠালো কুয়াশা এখনো ভিজে উঠছে পুরনো দস্তানার আড়ালের আরো পুরনো আঙ্গুলগুলোর ভাঁজে । নইলে কি ভাবেই বা ঘুম ভাঙলে এখনো ইঁদুরে কাটা লেপের লাল শালুর কভার দেওয়া বিছানা বালিশের সেই ট্রাঙ্ক-পত্তর খোলা ন্যাপথলিন এর গন্ধটা এখনো এই মধ্য তিরিশেও নাকে লেগে থাকে । আসলে মনে মনে বালক দিনের রেশমপোকা, সুতো জড়িয়ে জড়িয়ে যে মসলিন বোনে , সে মসলিনের স্মৃতি সোয়েটার বোনা শেষ হয়না কখনো । কত সহস্র শীতকাল ধরে , কত ভুল ঘর ঘুরে কাঁটা ওঠে, উলের অমরত্ব জুড়ে, কাঁটা পরে মায়াবী রোদ্দুরে । সে পশম গোলা অতীত থেকে শুধুই গড়িয়ে যায় ভবিষ্যতের শীতে, জড়িয়ে মরিয়ে যায় ধাপে ধাপে মধ্যবর্তী বছরগুলোর ঘটনা অঘটন নিয়ে ।
শীতকাল মানেই ছোটবেলার কতগুলো স্থির অনুষঙ্গ, যেগুলো আজীবন বদলায় না । আমার যেমন সেই নীল সাদা সোয়েটার’টা মনে পরে, নতুন’পিসির হাতে বোনা । বুনতে বুনতে কতবার ছোট্ট পিঠের ওপর মেলে মাপ নেওয়া আর হাসির হররা মাখা দুপুরের রসালাপ, তাপ নিতে নিতে বোনা ওই সোয়েটার’টা আজও আমার মনের দেহটাকে গরম করে রাখে, সে ওম ফুরনোর নয় । বন্ধুরা জিগ্যেস করলেই, জানিস, এটা আমার জন্যে নিজের হাতে করে দিয়েছে আমার পিসি …কেবলমাত্র আমার জন্যেই যে নিজের হাতে এমন একটা অদ্বিতীয় কীর্তি করা হয়েছে জগতে , সে আনন্দ সে বয়েসে অনেকখানি।.সেই বুক ফোলানো খুশি এখনো ভুস করে ভেসে ওঠে কোথাও | বিগ বাজারের ট্যাগ ছেঁড়া ইমপোর্টেড জ্যাকেট তো কই, সেই খুশি দেয় না ! আবার যেমন প্রথম ধুনুরীর হাতে লেপ তোষক তৈরির আনন্দ ।সকাল সকাল শাহজাদ কাকা হাজির , এক কাপ চা খেয়ে লেগে পড়ল বাড়ির সামনের দাওয়ায় তুলো ধোনার কাজে, আর আমরা ছোটরা সার সার বেঁধে সামনে । অদ্ভূত সুরে উঠছে পরছে, ধুনুরীর হাতের ছিলার সানাই, একটানা একঘেয়ে মন খারাপ শব্দের আবহে বাতাস জুড়ে উড়ছে ফুরফুরে শিমুল তুলো ইতস্তত, উত্তুরে হাওয়ার মাঝে মধ্যেই কয়েক পশলা দমকা আদর , ব্যাস, নিমেষে আমাদের ২৪৭, বাহির শ্রীরামপুর লেনের এঁদো গলি তখন দার্জিলিং কিম্বা বরফঢাকা মানালি। আসলে কল্পনাদের পাখা তো মেলাই থাকে, দেখা যায় না শুধু ।
শীতকাল মানে আদপে রোদের রং বদলানো একটা প্রলম্বিত সকাল । প্রায় দরজার মত লম্বা লম্বা গরাদ বসানো জানলা ছিল বাড়িতে সেকালে, বোধহয় ফ্রেঞ্চ উইন্দো বলা হত । সেই প্রচুর আলো আলো জানলার ধরে বসে আমাদের পড়া-পড়া খেলায় ভাগ বসাত অনেকে । এক বাটি মুড়ি বইয়ের মলাটের ওপর রাখা , তার অর্ধেক গেল পেটে আর বাকি অর্ধেক সামনের কাক, চড়ুই, শালিখ..”.তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা, মন” । লাফিয়ে লাফিয়ে একটা দুটো মুড়ি ঠোঁটের ডগায় নিয়ে ফুরুত করে উড়ছে পৌষের সকাল । গুড়ের নাগরী নিয়ে সাইকেল করে আসছে চেনা বিক্রেতা নগেন । ফি বছর শীতে তার বাঁধা ধরা বেসাতি । আরও একটু ভোরের দিকে খেজুর পাতার দোলায় চেপে আসাফুল মিয়ার টাটকা খেজুর রস আসতো ছলাত ছলাত । তরিঘরি রান্নাঘর থেকে এলুমিনিয়াম এর ডেকচি তে নেওয়া হলো খানিক , যতটা শব্দ করা যায়, ততখানি আওয়াজে সুরুত সুরুত করে চুমুক লাগলো মেজকা , তারপর হাত ঘুরে ঘুরে সেই মিষ্টি গুড়ের শীতকাল পাঁচমিশেলি সংসারের ঠোঁটের ডগায় ।
.আরো একজন ছিলেন যাকে ছাড়া শীতকাল ব্যাপারটাই অসম্পূর্ণ ছিল , তিনি মুস্তাক কাকা । প্রায় ৬ ফুট লম্বা আর ঝকঝকে সুদর্শন চেহারায় যে কোনো ফিল্মষ্টার কে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাঁচ গোল দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তার ।আসতেন কাশ্মির থেকে বাহারি পশমের শাল, সোয়েটার, টুপি নিয়ে কিন্তু আদতে ছিলেন আমাদের অন্দরমহলের মানুষ । মুস্তাক কাকার সাইকেলের টিং টিং শব্দ সদরে শোনা গেলেই, সেদিনের মত পড়াশোনার পাট চুকে গেল । আলাপী মানুষটি জমিয়ে বসতেন খাটের ওপরে , সব্বার কুশল খবর নিতেন আর আমাদের ভাই বোনেদের চোখ শুধু অনুসরণ করত কখন তার ফর্সা গোলাপী হাত দুটো ঢুকবে ওর ল- ও- ম- বা জোব্বার পকেটে , কারণ ওখান থেকেই তো বেরোত ফি-বছরের শীতের মনপসন্দ নজরানা । আখরোট , পেস্তা, খেজুর, কিসমিস আরও অনেক রকম নাম না জানা শুকনো ফল, মিষ্টি নিয়ে আসতেন মুস্তাক কাকা । ঠিক মনে করে, কার কোনটা পছন্দ । ঠিক যেন আমাদের জেঠু , কাকুদের মতই আপনার মানুষটি….শুধু থাকেন সেই কাশ্মিরে । কাশ্মির জায়গাটা তো তখনও চোখে দেখিনি, শাম্মী কাপুরের ফিল্মের পর্দায় দু চারবার ছাড়া , কিন্তু কাকার দাড়ি ভরা নবাবি মুখ, লম্বা খাড়া নাক আর ঝকঝকে সহৃদয় দুটো চোখ দেখলেই মনে হত , কাশ্মির জায়গাটা নিশ্চই খুব ভালো নইলে এমন মানুষ থাকে সেখানে !কাকা এলেই মায়ের হাতের চা আর ডিমের অমলেট ছিল বাঁধা , কখনো কখনো চিঁড়ের পোলাও ,চানাচুর এমনকি পরোটা তরকারী, যা হত বাড়িতে । বাবা, কাকা এসে যোগ দিতেন আমাদের আড্ডায়, সেই পাহাড় বরফ ঢাকা জায়গাটার কতরকম গল্পে বিভোর হয়ে থাকতাম আমরা । প্রতিবারই আড্ডা শেষ হত মুস্তাক কাকার গলার গান দিয়ে । এক্কেবারে মহম্মদ রফির মত মিষ্টি সুরেলা গলায় একটার পর একটা হিট গান, গাওয়ার আবদার আসতো সকলের কাছ থেকে । গানে, গল্পে আড্ডার শেষ পর্বে ঝোলা থেকে বেরোত যদিও নতুন শাল কিম্বা ফুলেল রঙিন কার্ডিগানের নকশা তোলা জামা অথচ কোনদিন ক্রেতা বিক্রেতার সম্পর্ক তৈরীই হয়নি সেই মানুষটির সাথে। খাট জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শীত পোশাকের স্তুপ তখন চার চিনার কিম্বা ডাল লেকের ঝিলমিল ছুটির হিমেল রোদে ভরিয়ে তুলত আমাদের চুন বালি খসা দুঃখী ঘরটাকে । হাতের মুঠোয় আখরোট ভরা দিনগুলো হয়ে যেত যেন শাহজাদা , শাহজাদীর আরব্যরজনী ।
সময়ের সাথে সাথে সেই দিনগুলো বদলে গেল । মুশতাক কাকা আসা বন্ধ করে দিল অনেকদিন |..প্রথম প্রথম ওঁর চেনা জানা কেউ এলে তার কাছ থেকে একটু আধটু খবর পাওয়া যেত, পরে সেটাও না ।.মনের অনেক নিচের দিকে কোনো একটা স্তরে প্রায় আবছা হতে শুরু করেছিল ওঁর হাসি হাসি মুখটা কিন্তু সময় যাকে ফিরিয়ে নেয় তাকে আবার জীবনের কোনো একটা হঠাত মোড়ে ফিরিয়ে দেয় ও । বছর পাঁচেক আগে অফিস যাওয়ার সময় আরো একজন শালওয়ালা কে সদরে দেখে বেশ অবাক এবং বিরক্তই হচ্ছিলাম, এই সাতসকালে আবার কেনাকাটির সময় কোথায় ! ছেলেটি নার্ভাস মুখে একটুকরো হালকা হাসি টেনে যখন ওর পরিচয় দিল, বুকের ভিতরে দাঁড় টানার শব্দ পেলুম, কতদিন পরে । ভালো করে চোখের দিকে তাকাতেই, সেই সতের আঠেরোর সদ্য যুবকের মুখে খুঁজে পেলাম তাঁর পিতার আদল । মুস্তাক কাকার একমাত্র ছেলে ইমতিয়াজ । সে আসছে তার দেশোয়ালি কাকা, দাদাদের সাথে এখন, ঠিক তার বাবার মতই সাইকেলের কেরিয়ারে পুঁটলি বেঁধে , টুকরো টুকরো কাশ্মির আর বঞ্চনার ইতিহাস নিয়ে । শুধু তার বাবার কথা জিগ্গেস করতেই চোখ নামিয়ে জানালো মিলিটান্ট’দের গুলিতে সেই মানুষটা ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে অনেকদিন । পিপুল গাছের হলদে হয়ে যাওয়া বাগিচায় পাতার নিচে ওর কবরে চাপা পরে রয়েছে, আমার শৈশবের সোনালী অঘ্রানদিন , মহম্মদ রফির শর্মিলা ,মিঠে গানের গুনগুন কলি , আর প্রায় ম্যাজিশিয়ানের আস্তিনফেরত আনন্দ মুঠো জমানো, ছোটবেলার আখরোট ।
তবু তো শীত আসে । মুস্তাক কাকার স্মৃতি নিয়ে, ছোটবেলার ওঠাপড়ার স্মৃতি নিয়ে, বয়েসের প্রলেপ লাগা দেহ আর তার অনেকখানি অন্দরে থাকা কমলালেবু ছোটবেলার মন নিয়ে, শীত আসে এখনো । আমার শহর জাগে ঠিক ভোর চারটেয় । আমি জাগি অর্ধেক জীবনের ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্ন নিয়ে । কুয়াশার সাদা চাদর এর আদরে ঢাকা ময়দানের মাথায় আবছা রহস্যে মেঘ সরিয়ে আড়মোড়া ভাঙ্গে ভিক্টোরিয়ার কালো পরি । তার বাঁশি উঁচিয়ে শান্ত সমুদ্রের মত ফেনা ওঠা বাসীঘুমে শহরের বুকে মাস্তুল তুলে, সে ইশারা করে ভোরের নবাগত সূর্যের দিকে । সে বাঁশির আওয়াজ আসে গঙ্গার বুকে ঠান্ডা মাটি জলের মধ্যে নতজানু ঠায় ভিজে নোঙ্গর ফেলা স্টিমার এর বুকের হাপর ঠেলে । সে আওয়াজ বড় করুন , বড় শান্ত | থেমে থেমে বেজে এ শহরকে জাগায় সে । নৌকার গলুই থেকে মুখ বাড়ায় মাঝির কালো মুখ । নদীর বুক থেকে তিরতির করে ওঠে টলটলে সুখের ধোঁয়া । হাওড়ার প্রাগৈতিহাসিক সেতু ছবি হয়ে ঝুলে থাকে রসিকার বক্ষবন্ধনির মত এ হৃদয় থেকে ও হৃদয় জুড়ে ,জলের সাথে শুরু হয় তার সকাল সকাল প্রেম পঁয়জার ।
ঘুম ভেঙ্গে ময়দান জুড়ে শুরু হয় উত্সাহী বাদামী ঘোড়াদের দাপাদাপি । জোড়া জোড়া পায়ের আঘাতে সবুজ ঘাসের বুকে মোলায়েম উত্তাপ লাগে । গত রাতের ভালোবাসাবাসির চিন্হ লুকিয়ে ফেলে ঘাস, তার নম্র বুকের গভীরে । ওদিকে নরম শান্ত গির্জার মত রোদ শতাব্দীর জারুল শিমুল এর আদিম গাম্ভীর্য থেকে আবডালে নেমে আসে ব্যস্ত অফিস পাড়ার প্রাতরাশে , টুক করে ছুঁয়ে দেয় হঠাতই আলাপী ট্রামলাইন কে আরও একবার । লজ্জায় আরও খানিকটা এঁকেবেঁকে লালচে হয়ে পাশ ফিরে শোয় সে । শুরু হয় শীত শহরের নকশী কথার হাট।
ছেলেদের ইশকুল বাসে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরি আর চাদ্দিকে এই খুশির ফরমান জারি হয়েছে দেখে, অজান্তেই মনটা খুশি তে ঝিলমিল করে ওঠে । টালা থেকে টালিগঞ্জে সাইকেল আর ট্রামের টিং টিং ঘন্টিতে দাঁত মাজে এ শহর ,এক চিলতে ব্যালকনির একটুকরো সুখে পাশাপাশি চা খায় অশীতিপর দাম্পত্য ,দুটো হলদেটে বেতের চেয়ারে । মানিকতলা বস্তির রশিদ নির্ভুল টিপে ছুঁড়ে দেয় দড়ি পাকানো খবরের কাগজ , কসবার হাউসিং এর তেতলার ব্যালকনিতে ।চেয়ারের ধরে কুন্ডলী পাকানো বেড়ালটা এক চোখ খুলে একবার পড়ে নেয় সে বৃত্তান্ত আবার ঘুমের নরমে ডুব দেবে বলে । চন্দ্রমল্লিকার টবের মাটি ঝেড়ে কাগজ তুলে হাতে নেয় রূপসী কলকাতা । আগের রাতের আই লাইনার ঘেঁটে যাওয়া ঘোলাটে চোখে ঘুম মুছে হঠাত হাতঘড়িতে সময় দেখে যাদবপুরের থার্ড ইয়ারের ছাত্রীটি । নরম কুশনে কাগজ নিয়ে ঠেস দিয়ে বসতেই মোবাইলের আট ইঞ্চি স্ক্রিনে হোয়াটস এপ এর সবুজ যুবক আলো জানান দেয় ‘গুড মর্নিং’ । দিল্লির লোধী গার্ডেনের সকাল থেকে প্রযুক্তির হাত্চিঠি নিয়ে আসে একটি আহির ভৈরোর গান এর এটাচমেন্ট , হলদেটে মুখের গোল পানা হাসিমুখের স্মাইলি, অমনি কলকাতা ছাড়িয়ে পাড়ি দেয় নিমেষে দিল্লির যুবকের মুঠোয়।
আমার ফেরার পথে দিন শুরু হয় বাগবাজারের মহাকালী মিষ্টান্ন ভান্ডারের সহদেব এর । অভ্যস্ত ব্যস্ততায় দ্রুত হাত সিঙ্গারার পুর ঠেসতে ঠেসতে সাবধানী মন উদাস হয়ে যায় তার কোনো কোনদিন ।এক ভাঁড় চা নিয়ে একটু বসি ওর পাশে । কেমন আছ গো ? বাড়ির সব কেমন ? মুখে ছায়া পড়ে সহদেবের । ‘আর বলবেন না , ছেলেটার জ্বর বেড়েছে বেশ , নদিয়া থেকে বউ এর ফোন এসেছিল গতরাতে’। ওদিকে ডালডার সুগন্ধে ম-ম গরম কড়ায় মুচমুচে ভাজা হয় সোনালী শহর । কাঠের বড় বারকোষে ছানা ঠেসে আদরের গুড় মেখে সারি সারি হাঁসেদের ছানা মিঠে রোদ্দুরের দিকে পিঠ করে বসে । চোখের মধ্যে একটি করে এলাচের দানা ফোটালেই তারা স্থান পাবে শো-কেসের শীতল অন্দরে । নতুন গুড়ের হাঁড়িটি তার বাবুই পাখির বাসার মতন গ্রামীন দেহাতি রূপে বড় বেমানান হয়ে ঝুলে থাকে কাউন্টারের একধারে , তার সঙ্গী হয় রঙিন নকশা কাটা জয়্নগরের মোয়ার শহুরে বাক্স । সবকিছুর অনেক ওপরে নির্বিঘ্নে বসে সব লক্ষ্য করেন গনেশ লক্ষী দেবাদিদেব আদি, ক্যালেন্ডারে উদাসীন প্রসন্নতায় । বাইরের বড় উনুনের ধোঁয়া তখন রোদের সঙ্গে শঙ্খ লেগে প্রনয় পার্বনে । অথচ সবকিছুর পরেও সহদেবের পিতৃত্বের চেনা চিন্তাটুকু ঝুলে থাকে সকালের ধোঁয়ায় ।ওকে খানিকটা ভরসা দিয়ে এগিয়ে চলি বাড়ির রাস্তায় ।’ সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখো ‘।
বাজার এর দিকে সকালবেলা একবার ঢু মারতে পারলে, সদ্য খেত থেকে তোলা টাটকা সবজির দেখা মিলবেই । দুটো হাসিখুশি ফুলকপির মাথা বাজারের ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতেই হঠাত খেয়াল হলো, কখন জানি জীবনের এই মিঠেকড়া রাস্তাটা অনেকটা পেরিয়ে এলাম । ঠিক এমন করেই তো আমার মাতামহকে দেখেছি, সকালবেলার বাজার সেরে ফিরতে । তখন লেপের আড়াল থেকে চোখ পিটপিট করে দেখতাম তাঁকে । সাতসকালেই আটপৌরে ফতুয়া আর ধপধপে সাদা ধুতি পড়ে,মানুষটি সাইকেল নিয়ে গেট ঢেলে ঢুকছেন । হাতে বাজারের ব্যাগ , আর তার মুখ দিয়ে উঁকি মারছে বাগান ফেরত শিশির ধোয়া শাক সবজি ।
বাজার ফেরত ব্যাগটাকে রান্নাঘরের দোরগোড়ায় রেখে একটু জিরিয়ে নিতেন তিনি ।দিদিমা কে ডেকে বলতেন, ‘শুনছ , আজ খুব ভালো দিশি পালং পাওয়া গ্যালো অনেকদিন পরে । বেগুন আর বড়ি দিয়ে বেশ ডুমো ডুমো করে কোরো এখন ।‘ চায়ের জন্য গলাটা খুব উশখুশ করছে বটে, তবে গিন্নির মেজাজ দেখে তবেই আবদারটা পাড়তেন । ও ঘরে হারমোনিয়াম তুফান তুলেছে ততক্ষণে সাধন মাস্টার । আমার ছোট মাসি দক্ষিণীতে গান শিখতেন । তার জন্যেই বাড়িতে সকাল বিকেল প্র্যাকটিসের সুবন্দোবস্ত । মাতামহ এক কাপ চা নিয়ে বারান্দায় বসতেন , ও ঘর থেকে গানের কলি ভেসে আসতো |”রাজপুরীতে বাজায় বাঁশি..”,,,দাদামশাই দুই দিকে ঘাড় নাড়তে নাড়তে বলতেন , ‘আহা, কতদিন পরে সেই ফরিদপুরের সকাল মনে পরে গেল’ । ওদিকে দিদিমা আজ দেরাজ খুলে বের করেছেন দস্তুরমত পুরনো আলোয়ান , পশমি ফুলতলা চাদর আর লাল শালু তে মোড়া লেপ । সব রোদে দিয়ে তবে না গায়ে দেওয়া । কার্তিক মাসের হিম , এ বড় গায়ে লেগে যায় । দেরাজের একেবারে পিছনের দিকে হাত বাড়াতেই বেরিয়ে এলো লাল ডুরে তাঁতের শান্তিপুরী শাড়িটা । পাড়ে সোনালী হাঁসের আল্পনা আঁকা । জায়গায় জায়গায় নেপথলিনের গন্ধে ভেজা স্মৃতিতে পিঁজে গিয়েছে শাড়িটা । ওমা, এটা এখেনে ছিল । গালে হাত দিয়ে বুড়ি ভাবতে বসলেন, এ হল তার সেই ছেষট্টি সালের শাড়ি । কলকাতায় বদলির খবর এলো আর কত্তা হাটবারে গিয়ে কিনে আনলেন এই শাড়ি ।সে কি আজকের কথা । কি আনন্দ ওটা হাতে পেয়ে তাঁর । চুপি চুপি গিয়ে শাড়িটা পরে নিজেকেই আয়নায় দেখে মুখ টিপে হাসলেন । গরম ধোঁওয়া ওঠা চা এর কাপ ছলকে গেল আজ , কাঁপা হাতে লাজুক মুখে গিয়ে দাদামশাইকে ধরালেন কাপ । খবরের কাগজ সরিয়ে ছানা বড়া চোখে দাদামশাই দেখলেন সব, চশমাটা চোখ থেকে খুলে হঠাত সে কি হো হো হাসি । ছাদের পায়রারা এ সব খুনসুটি দেখে হাসির হররায় উড়ে যেত ভবানীপুরের ছাদ থেকে । সকালের রোদ নতুন গুড়ের মত রক্তাভো লাল হত, কলকাতা নড়েচড়ে বসতো সকালের এই বেগমবাহার রূপ দেখে ।কিছু কিছু কিসসা কোনদিন ফুরায় না , কিছু কিছু শীতকাল ও| এসব এখন শুনলে অলৌকিক লাগে, মনে হয় আর জন্মের গল্প ।তবু তো এ গল্প ফুরোয় না । প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে ।

Leave a Reply


Your email address will not be published. Required fields are marked *