Bengali Uncategorized

ফার্স্ট পার্সন ~

FacebookTwitterGoogleLinkedIn


“The room is still the same, just the picture is tiltedUnlike the lost monsoon’s last hoursThere were rain-drenched flowers in the gardenMorning glory showers .

 

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দভৈরবি’ অনেকেই পড়েছেন । সেই যে, ” আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি, এমনি ছিল না আষার শেষের বেলা ,উদ্যানে ছিল বরষা- পীড়িত ফুল, আনন্দ ভৈরবী। ..” তো সেই কবিতার ইংরিজি অনুবাদ করেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ, সম্ভবত রেনকোট ছবিটি তৈরির সময়ে । যদিও মূল ছবিতে শেষ পর্যন্ত যে লাইনগুলো শোনা যায়, সেটা হিন্দিতে লিখেছিলেন গুলজার । কিন্তু ঋতুদার লেখা এই ইন্টারপ্রিটেশনটি আমার ব্যক্তিগতভাবে খুব প্রিয় ও তাই মনে রয়ে গেছে বহুদিন । ‘সে কি জানিত না, এমন দুঃসময় ‘এর’, এই অনুবাদে হয়েছে “Didn’t she know bad times in haste ?” অর্থাত ‘সে’ সর্বনামটা অনুবাদে she করেছেন, অথচ মূল কবিতায় ধরার উপায় নেই, এটি পুরুষ অথবা মহিলার কথা ভেবেই লেখা , বিশেষত যেখানে he হতে পারত, সেখানেও she এর প্রতি এই পক্ষপাত বোধহয় ব্যক্তি ঋতুপর্ণের অন্তর্চেতনায় মগ্ন নারীসত্তাকেই তুলে আনে বারেবারে, যা ওঁর অনেক সৃষ্টিতে ফুটে ওঠে অনায়াসে। মধ্যবিত্ত বাঙালির নারী ও নারী সম্পর্কিত যাবত ধারণা, শোভন, অশোভন কৌতুহল, দেহবোধ ছাড়িয়ে তার অভিমানিনী হৃদয়ের আশ্চর্যকথা গত পঞ্চাশ বছরের নিরিখে ঋতুপর্ণ যেভাবে বলে গেছেন, তার কাজে যেভাবে বারবার এনেছেন মেয়েদের একান্ত গোপন অন্তরের কবাট খোলা ইচ্ছের দিনলিপি ,সেভাবে বোধহয় কোনো নারী ও বলতে পারেননি তাঁর কথা, তাঁদের নিজেদের কথা। ঠিক সেই কারণেই শুধু আন্তর্জাতিক খ্যাতিপ্রাপ্ত ছবিওয়ালা হয়েই ওঁর জনমানসের অবস্থানটা নির্ধারিত হয়নি, তিনি নিজের জায়গাটা বড় স্পষ্ট করে বিভাজনহীন ভাবে এঁকে গিয়েছেন সাধারণ মানুষের বোধের নিভৃতে, যেখানে জ্ঞান,বুদ্ধি, শৈল্পিক বাহাদুরি বা এক্সপ্রেশন অফ এক্সেলেন্স নয় , শেষ কথা বলে অনুভব । মায়ের সাথে মেয়ের সম্পর্ক, বাবার সাথে ছেলের সম্পর্ক, ঠাকুমার সাথে নাতনির সম্পর্ক, আর এমনি অনেক অনেক জটিলতর সম্পর্ক যা নিয়ে বাংলা ছবি চুপ থেকেছে এতদিন, যা নিয়ে সাহিত্যের আড়াল নিয়েছেন মানুষ, কিন্তু পপুলার মিডিয়ামে তাকে প্রয়োজনীয় জায়গা করে দেননি, সেই সেই আড়াল ভেঙ্গেছেন যিনি, তিনি ঋতুপর্ণ। নিজে যে বিদ্রুপের শিকার হয়েছেন , অক্লেশে সেই ব্যক্তিগত অপমানকে, আক্রমনকে আলোয় মেলে ধরেছেন, তাঁর ছবিতে । পরিচালক হিসেবে যে কথা বলছেন, আর ব্যক্তি মানুষ হিসেবে যা বলতে চেয়েছেন, কি অনায়াসে মিলে মিশে গেছে তাঁর কাজে ।

ওঁর মধ্যে একটা সহজাত সুন্দরকে দেখার চোখ ছিল। যা সুন্দর, তাঁকে শিল্পের শরীরে অলংকার হিসেবে পরিয়ে এক অনায়াস আমোদ পেতেন তিনি । শুধুমাত্র বিজ্ঞাপন সংস্থার পেশাদারিত্ব নয়, সুন্দরকে খোঁজার এই নিরলস চেষ্টাটা বোধহয় ওর জন্মগত একটা গুন । যে কারণে, যখন যেখানে যা করছেন, সেটার মধ্যেই ধরা দিত এ যাবত অধরা ,অন্তর্লীন এক সৌন্দর্য । সেটা সিনেমার সেট হোক, কিংবা চিত্রনাট্যের কোনো শব্দ, সেটা কাগজের ‘সম্পাদকীয়’ হোক অথবা পোশাকের ছাঁদ, ওঁর নিজস্ব সিগনেচার সাবলীলতা , ধরা পড়ত সবসময় । এমনকি চরিত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এমন সব প্রথা ভাঙ্গা আইডিয়ার জন্ম দিয়েছিলেন উনি, যা এক বাক্যে ট্রেন্ড নির্মান করেছে বহু ক্ষেত্রে ।

 

ঋতুপর্ণ ঠিক কি করেছেন, আর কি করেননি সেই আলোচনায় আসতে গেলে, এইটাই প্রথমে মনে হয়, তিনি সত্যজিত ও রবীন্দ্র উত্তর বাঙালির হারানো লেগেসিকে আবার ফিরিয়ে এনে দিয়েছেন, সঁপে দিয়েছেন আত্মবিস্মৃত বাঙালির কাছে । ভাবুক বাঙালি, শিল্পী বাঙালি, পড়ুয়া বাঙালি আর অভিমানী বাঙালির সাথে যে লড়াকু বাঙালির ছবি আমাদের আশৈশব চেনা যাঁর সংজ্ঞা আমরা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম এই হালফিলের ককটেল কালচারের দাপটে, তাকে মেনস্ট্রিম করে রি-কন্স্ত্রাক্ট করে তুলেছিলেন তিনিই।একদিকে শিকড়ের সন্ধান আর তার সাথেই প্রগ্রেসিভ নাগরিক ক্লান্তি যেখানে সমান্তরালে মেশে, সেই সাময়িক সংকট ওঁর ছবিতে মানুষ যেভাবে ফিরে পেয়েছেন, তাঁর জন্যে আমাদের প্রজন্ম তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেই। সত্যজিত পরবর্তী প্রজন্মে আমরা যাঁরা ছোটবেলায় মৃনাল দেখেছি, বুদ্ধদেব দেখেছি, উত্পলেন্দু দেখেছি , বৌদ্ধিক সিনেমার সাথে ,প্রগতিশীল ছবির সাথে বানিজ্য সফল ছবির স্পষ্ট মেরুকরণ দেখেছি, তাদের কাছে ঋতুপর্ণ একটা স্পষ্ট জ্বলজ্বলে অবস্থান, যেখানে ছবির সাফল্য শুধুই তার বক্সে নয় অথবা কন্টেন্টের বাড়াবাড়ি রকম দুর্বোধ্য আভিজাত্যে নয় , ছবির সাফল্য , তা মানুষের কথা বলতে পেরেছে বলে ।

 

তবে শুধুই কি চলচ্চিত্রকার, কেবলি সাহিত্যের মুগ্ধ দ্রষ্টা এবং লেখক, নাকি দ্বিধাহীন যৌন পরিচয়ের ‘পোস্টার বয়’ ? কি হিসেবে ঋতুপর্ণ রয়ে যাবেন আগামীতেও ? ওঁর জন্মদিনে ওঁকে মনে করবার আরও অনেক ,অজস্র কারণ রয়ে যায় বোধহয় ওঁর সেই সব কাজে , যে কাজে ওঁর মত প্রান্তিক যৌনতা স্পৃষ্ট আরও অনেক মানুষ নিজেদের ব্যক্তি পরিচিতি খুঁজে পেয়েছেন , একটা যুথবদ্ধ দল পেয়েছেন যারা , নিজেদের কথা শোনানোর একটা প্লাটফর্ম পেয়েছেন তাঁরা। আজ যে ছেলেটি নাচের গ্রুপে কাজ করেন, হাওড়া রামরাজাতলা থেকে ওঁর কাজের জায়গায় এতদিন যাঁকে মাথা নিচু করে রাস্তা পার হতে হতো , কানে দুল, ইষৎ মেয়েলি যার পরিচ্ছদ ,হাঁটা চলা , অজস্র টিটকিরি শুনে শুনে যার নিজের প্রতি ঘেন্না ধরে গেছিল, আজ সে আর বোধহয় তার যৌন পছন্দের জন্য এতটা গলাধাক্কা খায় না । আজ যে বহুজাতিকে কর্মরত সফল পুরুষ অনায়াসে তার পুরুষ সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক সোশ্যাল মিডিয়ায় সেলিব্রেট করছেন এবং সে সেলিব্রেশনে অংশ নিচ্ছেন তার মা, বাবা ও পরিবার, সেই সহজাত, আনন্দিত খোলা হাওয়া তাঁদের কাজে, তাঁদের কথায় যারা সহজ করে তুললেন , তাদের মধ্যে অন্যতম তিনি, ঋতুপর্ণ ঘোষ ।

গোড়াতে ফিরে গিয়ে যদি আবারও বলি,…” The room is still the same, just the picture is tilted, Unlike the lost monsoon’s last hours”… সবই তো একই রকম আছে, তবে চলে গেলেন কেন ? বড় তাড়া ছিল আপনার, আরও অনেক কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে গেলেন । শুধুই অভিমান ,নাকি সব আত্মহত্যাই একপ্রকার হত্যা, সব মৃত্যুই একপ্রকার হনন ? থাক। জন্মদিনে এসব কথা আর নাই বা বললাম। ভালো থাকবেন ।

Leave a Reply


Your email address will not be published. Required fields are marked *