Bengali Uncategorized

প্রো-গো-তিশীল

FacebookTwitterGoogleLinkedIn


না ,আমার গোমাংসে রুচি নাই ।এমনকি শুকরের মাংসেও নহে । এক্ষণে পাঠক আমায় ধর্মান্ধ এবং টিকি দাড়ি স্পৃষ্ট ছুঁতমার্গীয় শ্রেণী উন্নাসিক প্রতিনিধি বলিয়া ঠাহর করিয়া লইতেই পারেন । সে তাহাদের ব্যক্তিগত অভিরুচি । কিন্তু আপন বক্তব্য পেশ করিতে গিয়া পাশের বাড়ির ভদ্রজনগণ সে বিষয়ে কি অভিমত পোষণ করেন বা করিবেন, মায় আমার বক্তব্যের সমর্থন করিবেন নাকি চূড়ান্ত অসমর্থনে আমার ধোপা নাপিত বন্ধ করিবেন , সে ভয় আমার নাই । তাই অকুন্ঠে বলি, গোমাংস ও বরাহ নন্দন উভয়ই গ্রহণ করিয়াছি এবং তাতে আমার ব্রাহ্মনত্বে বিশেষ হেলদোল হয় নাই । আমি এখনো শুদ্ধাচারে কালিপুজো করিতে সক্ষম এবং আমার ‘জাত’ জানলা দিয়া উড়াইয়া পলায় নাই । তবে কিনা সে মাংস আমার বিশেষ স্বাদু বোধ হয় নাই , এবং তাই তাহা দ্বিতীয় বার গ্রহণ করিবার ইচ্ছে হয় নাই, সে পৃথক প্রশ্ন । সেই অর্থে তো আমি কুম্ভীরের মাংস অথবা আর্মাডিলোর দেহাংশও সেবন করি নাই, তবে তাহা কি আমার জাতীয়তাবাদের কোনো প্রকার পরিমাপক হইতে পারে ?
হয়ত বা পারে, যদি আমাদের মহামহিম সরকার বাহাদুর তাহাই হিন্দুত্বের মাপকাঠি বলিয়া নির্ধারণ করেন । দেশ জুড়ে যারা গোমাংস ভক্ষণ করিতেন আর যারা করিতেন না, তাহারা স্বধর্মেই কালাতিপাত করিতেছিলেন, যার যাহা স্বভাব । কথিত আছে, ‘আপনি আচরি ধর্ম ‘ । তো সহসা এই শোরগোলে খামোকা কিছু গরিব লোকের প্রাণ গেল, আর ঘোলা জলে মত্স্য শিকার করিলেন গৈরিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক এর দল । মত্স্য শিকার আগেও ছিল , থাকিবেও । কিন্তু দেশের আপামর জনতা কি খাইবে, কি পরিবে, দিনান্তে ঘরে ফিরিয়া আপন পত্নীর সাথে মৈথুনে রত হইবে কি হইবে না, তাহা নির্ধারণ করাও কি এখন সরকার বাহাদুরের কর্মসূচি ভুক্ত ? সদুত্তর দিবেন উন্নয়নের কান্ডারী প্রধানমন্ত্রী মহোদয় । কিন্তু দুর্ভাগ্য বশত, সদুত্তর তো দূর অস্ত, তাঁর দীর্ঘ নিরুত্তর হয়ে থাকাটাও প্রাচীন প্রবাদ কে স্মরণে এনে দেয়, ‘মৌনং সম্মতি লক্ষনম ‘ । আপন গৃহে অগ্নিসংযোগ ঘটিলে প্রতিবেশীকে ডাকাটাই আশু কর্তব্য । তা না করিয়া আপন দলের বড় , ছোটো, মাঝারি মাপের জন গণ মন অধি নায়কনায়িকাগণ কোনপ্রকার চিত্রনাট্য ছাড়াই ‘যা খুশি তাই’ বক্তব্য দিয়া দেশব্যাপী প্রজ্জ্বলনের অগ্নিতে ঘৃতাহুতি প্রদান করিবেন , আর মহামহিম ‘উন্নয়নের আড়ালে ‘ সেই অগ্নিকান্ডকে প্রশ্রয় দিবেন, সেটি বুদ্ধিমানের কর্ম নহে । সহিষ্ণুতা, অসহিষ্ণুতার অসংখ্য উদাহরণ এ দেশের শিশুপাঠ্য ইতিহাস । ‘দিবে আর নিবে, মিলাবে, মিলিবে , যাবে না ফিরে’র চারণভূমি এই ভারতবর্ষ । সকল প্রকার ধর্ম, শ্রেণী, গোত্র, বর্ণের উচ্চনিচ হরেক কিসিমের মানুষের মিলনমেলা এ দেশ । একান্নবর্তী পরিবারে, এ ঘরের থালা ও ঘরের বাটির সাথে চালাচালিও হয় যেমন, ঠোকাঠুকিতেও তার ব্যতিক্রম নাই । ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এখানে নতুন কিছু নহে । তবে সংসারের গুরুজন যদি সেই অসহিষ্ণুতাকে দিনান্তে প্রশ্রয় দেন, কোনো পক্ষপাতিত্বের পথ নেন , সে সংসারে বিপদ আসন্ন ।
শুধু কেন্দ্র কেন, রাজ্যেও এমন উদাহরণ প্রভূত । কে , কি সংবাদপত্র পড়িবেন , মহিলারা শাড়ি ছাড়িয়া অশ্লীল সালোয়ারে বা পাশ্চাত্য পোশাকে নিজেকে ভূষিত করিয়া ইশকুল কলেজে যাইবেন কিনা, টেলিভিশনে কে কোন চ্যানেল দেখিবেন আর কি দেখিবেন না , তাহা লয়িয়া রাজ্য সরকারের তরফ থেকেও অনেক প্রকার ফতোয়া ফরমান জারি , স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল । এমনকি শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারী শাসনের অনুপ্রবেশ অথবা যৌন প্রান্তিকতার অবমাননায় এ শহর, এ দেশ গর্জে উঠেছে বারংবার । উঠিবেও । তবে সুখের কথা, এতদিন তাহা আমাদের রসুইতে প্রবেশ করে নাই । কিন্তু গৈরিকতা যদি সে সীমাও অতিক্রম করিয়া যায়, তবে সত্যই বড় উষ্মা, বড় অসহিষ্ণু সময়ের মধ্যে দিয়া এ দেশ যাইতেছে । প্রগতিশীল সাজিয়া রাজপথে গোমাংস ভক্ষণ করিলেই যেমন প্রগতিশীল হওয়া যায় না তেমনিই গৈরিক রং পরিধান করিলেই জাতীয়তাবাদী হওয়া যায় না । হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী রক্তচক্ষু ধর্ম সৈনিক হইয়া, এদিক ওদিক ইষৎ বেচাল দেখিলেই মুন্ডপাত করিব , এমন বহুত্ববাদে এ দেশ বিশ্বাসী নহে । বাহিরে উন্নয়নের মুখোশ ও তলে তলে তালিবানি উগ্র দেশত্ববোধকে তালি দিয়া পিঠ চাপড়ানি, উভয় একসাথে চলিতে পারে না । আপনাদের পৃষ্ঠপোষকতায় একদিকে মার্ক জুকেরবার্গ এ দেশে আসিবেন, ডিজিটাল ভারতবর্ষের প্রনয়ন করিবেন, যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক যুগবদলের ভরসা প্রদান করিবেন । আপামর জনসাধারণের হাতের মুঠোয় মুঠোয় তুলে দেবেন ফেসবুক । আর অন্য দিকে শুধুমাত্র পিপিলিকা ভক্ষণ করিয়া দিন কাটাইবে প্রত্যন্ত প্রান্তের কালাহান্ডি অথবা আমলাশোলের অভুক্ত মানুষ । ডিজিটাল বিপ্লবে ভারতবাসী অখুশি নহে কিন্তু অনাহার , অর্ধাহার যেখানে এখনো একটি দগদগে সমস্যা, সেখানে গোমাংস বা ছাগ মাংস ভক্ষণ নিয়ে জলঘোলা করাটা ঠিক কতটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ধর্মীয় মেরুকরণ , তা বোঝার ক্ষমতা অভিজ্ঞ দেশবাসীর রয়েছে ।
কাজেই পয়গম্বর না সাজিয়া, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের পাশে থাকুন । দেশ জুড়ে সাহিত্যিক, শিল্পী, অভিনেতা, পরিবেশবিদ, ইতিহাসবিদ, বিজ্ঞানী সকলের তরফ থেকে যে সম্নিলিত অনাস্থা ও ঘৃনা জমা হইতেছে এই তথাকথিত উন্নয়নমুখী পশ্চাত্পসরনের প্রতি, তাহার অকাট্য প্রতিক্রিয়া কি আপনাদের ভারতীয় জনতা পার্টির কর্তা ব্যক্তিরা কৌশলী রাজনীতির মেঘের আড়াল হইতে লক্ষ্য করিতেছেন ? গোরক্ষণে আপনাদের বিশেষ উদ্যোগ আর রাষ্ট্রীয় ঐক্যের সংরক্ষণে তাহার লেশমাত্র লক্ষিত হয় না , এ আর যাই হউক, উন্নয়নগামিতা নহে ।

Leave a Reply


Your email address will not be published. Required fields are marked *