Bangladesh Bengali

নির্বাসিত – চিত্র আলোচনা

FacebookTwitterGoogleLinkedIn


না, মানে ঠিক রিভিউ লিখব বলে বসিনি এবার , কেননা এ ছবিটি আমায় সেই গড়পরতা আর পাঁচটি সম্ভাব্য ভালো ছবি দেখা অথবা তার আলোচনা করার পৌণপুনিকতা থেকে বিরত করেছে ।এ ছবি দানা বেঁধেছে মনের এমন এক বিপন্ন গহনে , যেখানকার নির্বাসনের বিষন্ন শাসন থেকে মুক্তি পাইনি আমি , এখনো । নন্দন তত্ব কি বলে জানি না , কিন্তু ‘নির্বাসিত’ দেখার পর ‘নন্দন’ প্রেক্ষাঘর থেকে বেরিয়ে এলাম যখন তখনও অসম্ভব শীতে কুঁকড়ে ছিল ভিতরটা। শো-ভাঙ্গা বিকেলের বাইরেটা তখন প্রায় নীলচে অন্ধকারে ঢেকে গ্যাছে । রাস্তার ওপারের মোহর কুঞ্জের গাছের উঁচু মগডালগুলোতে ডানা ঝটপট করে উড়ে যাচ্ছে , আবার এসে বসছে পাখিদের ঝাঁক । আমি শুধু ওদের কালো সিলুয়েটে উড়ে যাওয়া দেখছি । দিনের শেষে বাকি সব্বার মত ফিরে যাওয়ার একটা ঠিকানা চাই ওদেরও । প্রিয় ডাল, প্রিয় গাছ । পায়ের পাতায় আঁকড়ে ধরা বিশ্রামের এক টুকরো জমিন।  আমার কাছে যেমন, আমার শহর । ফেরা পথের,  ঘেরা পথের, সেরা পথের শহর । এই মুহুর্তে সন্ধ্যে নীল রঙের না আলো, না অন্ধকারে মোড়া যে শহরের বুক দিয়ে হুস হাস করে ছুটে চলেছে তীব্র উষ্ণ হলুদ আলো জ্বালা গাড়ি । ওদেরও ফিরে যাওয়ার সময় এখন ।………. আর যাদের ফেরা হলো না, যাদের ফেরা হয়না, হবে না কোনদিনও , তাদের ? খুব শীত করে উঠলো এই শেষ শ্রাবনেও ।

 

আসলে নির্বাসন , শুধু একমাত্রিক নয় । প্রথা মেনে, দেশ থেকে ,সমাজ থেকে, চেনা মানুষের গন্ডি, পরিধি থেকে বিতাড়ন বা দুরে সরিয়ে দেওয়ার যে পদ্ধতি তা রাজনৈতিক, সামাজিক বা পারিবারিক যে কোনো কারণেই হোক না কেন, আদপে তা নির্বাসন । নিজের চেনা বিছানা ,বালিশ, চেনা ঘর ,জন্ম থেকে চেনা মুখের মা, বাবা, আত্মীয় বন্ধু, চেনা পাড়া, চেনা গাছ, মায় চেনা গন্ধটুকুও পিছনে, অনেকখানি পিছনে ফেলে এক দিকশুন্যপুরের দিকে অগস্ত্য যাত্রা । ফেরা হবে কি, আদৌ ? কারোর কারোর ক্ষেত্রে ফেরার আশা ধিকধিক করে বেঁচে থাকে আবার কারোর ক্ষেত্রে সে পথও বন্ধ, শুধু অপেক্ষা সম্বল ।এক সময় অপেক্ষাটাও দম ফুরিয়ে মরে যায় যেমন হয় , এ ছবির জনৈকা নারীর , যাঁকে টাইটেল কার্ডে ‘নারীই’ বলা হয়, শুধু একজন জনৈকা ‘নারী’ । ছবির পোস্টারে বলা হয়, ‘নারীর কোনো দেশ নেই’ । এমন কি , তাঁর আদরের বেড়ালটিরও কি চমত্কার নাম ( যেমন তেমন নয়, একেবারে ‘বাঘিনী’ ) অথচ সেই জনৈকা  মহিলার ( নাকি, লেখিকা ? )  কোনো নাম নেই । নাম নেই, দেশ নেই, পৃথিবীর এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে ফেরার মোড়ে মোড়ে যিনি ফেলে এসেছেন পূর্বপরিচয় কে ঝরা পাতার মত, নিঃশেষে ।’নির্বাসিত’ সেই  নারীর গল্প । তাঁকে আপনি তসলিমা বলুন, তাঁকে আপনি এম.এফ.হুসেন বলুন অথবা ভাগ্য তাড়িত এমন যে কোনো শিল্পীর কাফেরনামা বলুন, শেষ পর্যন্ত এঁরা ‘ ঘরে ফেরে নাই’। এঁদের দেশ এদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করেছেন, এঁদের যাবত কাজ, তাবত  কথাকে গভীরতম অস্বস্তিতে মুহুর্তে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে মৃত্যু পরোয়ানা লিখে দিয়েছে, মৌলবাদের হাত ,সন্ত্রাসের বিরলতম ‘ওয়ারেন্ট ‘। পৃথিবীর তাবত সন্মানের প্রাপক হয়েও তাই এঁরা নিজেদের দেশে ব্রাত্য, এলেই মাথা কেটে নেওয়ার বরাত নিয়েছে সুচিন্তিত, প্রিয় দেশ, প্রিয় জমিন, প্রিয় মানুষ  ।

 

নির্বাসিত, এক গভীর বিষাদের এলিজি । লেখিকা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, তাঁর আত্মরক্ষার্থে তাকে ভর সন্ধ্যে বেলায় মাথায় শাল মুড়ি দিয়ে একদল লোক গোপনে তাড়িয়ে নিয়ে যায় অন্য দেশে । প্রিয় বেড়ালের মুখের সামনে পড়ে থাকে অসমাপ্ত মাছের বাটি, পড়ে থাকে অসমাপ্ত ঘরকন্না , খোলা পড়ে থাকে হাট কপাট ,কিছু নেওয়া হয় না শেষ অবধি । পরিচিত, সাধের কাজলের ছোট ডিবেটুকু আর তার মধ্যে স্মৃতির কর্পুর মাখা একটা গোটা জীবন এর মায়াকাজল, সাবলীল আত্মপরিচিতি হাতের মুঠোয় নিয়ে নতুন আস্তানা খুঁজতে বেরোতে হয় সেই প্রিয় নারী কে, সমাজ যাকে তাড়িয়েছে। এক দেশ থেকে , আরেক দেশে, এক হিমঘর থেকে আরেক হিমসমুদ্রে শুধু অন্তহীন ভেসে চলার জন্যে যার বাঁচা । বেয়নেট পাহারায় রাতজাগা ক্লান্ত, কালি মাখা চোখের ওপর ভেসে থাকে, দেশে ফেলে আসা ‘মেয়ের’ মায়া স্তব্ধ চোখ, পায়ে পায়ে ক্ষুধার্ত বেড়ালের মত বিষাদ ঘুরে ফেরে আর একাকিত্বের যন্ত্রনায় সেই মেয়েটি, সেই সাহসিনী মেয়েটিও কনফেস করে ‘মসীর সাথে অসির লড়াইয়ে অসিই যেতে ‘, শেষ পর্যন্ত । ঝুরঝুর করে ঝরে পরে বিদেশী বরফ, অন্তহীন মধ্যরাতের সুর্যোদয়ের দেশে, কিন্তু সূর্য ওঠে কই ? শুধু বিষাদ শীতল  কাঁচের ওপর বরফের অক্ষরে কাঁপা কাঁপা আঙ্গুল বুলিয়ে  মেয়েটি লিখে চলে .. মাতৃভাষা।..তাঁর স্মৃতিতে, সত্তায় ঢেউ তোলে শিতলাখ্যার পানি , তাঁর শেষ রাতের ভোরের ঘুমে আজান ডাক দেয় ময়মনসিঙ্গের সুলতানপুরের মসজিদ, জ্বরের উত্তাপে তাঁর আঙ্গুল খোঁজে তাঁর মায়ের, তাঁর ঈদুল আরার গরম হাতের ছোঁয়াটুকু  …শুধু বারবার নিজেকে বোঝায়, নিজেকে আদর করে নিজেরই পিঠ চাপড়িয়ে বলে, একদিন সে ফিরবেই, ফিরতেই হবে তাকে ।

 

এ ছবির দৈর্ঘ্য, স্বল্পায়ু , মাত্র এক ঘন্টা পয়তাল্লিশ মিনিটের প্রায় বেরং ফ্রেমগুলোতে শুধুই তুষার কবরের শুনশান নির্লিপ্তি আর ওভার কোটের নিচে থরথর করে কাঁপা একটা দিশী হৃদয়, যে দেশে থাকতে চেয়েছিল, তার প্রিয় কুয়োতলা ঘিরে, প্রিয় বন্ধুর সান্নিধ্যে আর  প্রিয় কন্যা আদরের ‘বাঘিনী’ কে নিয়ে । শীর্ষ রায়ের ক্যামেরা অনায়াসে এ ছবিকে নিয়ে যায় বুদ্ধি ও দর্শনের বাইরের সেই দর্শনে , যেখানে গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠে কান্না, মুচড়ে ওঠে কষ্ট..আর হঠাত মনে হয়, মাকে অনেকদিন ছুঁয়ে দেখা হয়নি, আদর করা হয়নি প্রিয় বারান্দার এক কোনে সাধের গোলাপ গাছটিকে, ক্যামেরা আর ক্যামেরা থাকে না, প্রায় তরল হয়ে প্রতিটি ফ্রেমের  অংশীদার করে তোলে দর্শকদেরও। অভিনয় ?… না. অভিনয় বলব না, চুর্নীকে বলব, এই আর্তিটুকু , এই মনখারাপ এর গা শিরশির করা এপিটাফটুকু আমাদের দিয়ে, আপনি আমাদের ঋদ্ধ করলেন, আমরা ঋণী হয়ে রইলাম। শাশ্বত , রাইমা, লিয়া, জোয়াকিম এরা প্রত্যেকে এই ছবিকে কবিতা বানিয়েছেন । আর এডিটিং বা শব্দ পরিকল্পনার কথা না বললে এ লেখা স্বভাবতই অসমাপ্ত । কি অসম্ভব মুন্সিয়ানায় ফ্রেম থেকে ফ্রেম ছিঁড়ে এ কষ্টকাব্য লিখেছেন ,ছিঁড়েছেন, জুড়েছেন বোধাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় । আবহে এক অনুচ্চকিত বিষাদে বারেবার  বেজেছে ‘আমার সোনার বাংলা , আমি তোমায় ভালোবাসি ‘, চোখের কোল ভিজে এসেছে সঙ্গীতের ব্যবহারে , রাজা নারায়ন দেব , আপনাকে কুর্নিশ ।

 

অনেকগুলো সত্যি গল্পের শেষে শেষ মেষ আরেকটা চোখে দেখা গল্প বলি । তখন আমার বছর উনিশ, পূর্বপুরুষের ভিটে আঁকড়ে বেড়ে ওঠা আমাদের সেই মফস্বল শহরে তখন অন্য রকম উন্নতির হাওয়া বইতে সবে শুরু করেছে ।হঠাত শহরে ভালো জীবন যাপনের খোঁজ পেয়েছেন, শহরতলির এজমালি যৌথ সংসারে বেড়ে ওঠা মানুষ । আমার এক জ্যাঠামশাই, তার বাড়ি বিক্রি করে চললেন কলকাতায় । বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে, মালপত্র উঠছে একে একে। মা, কাকিমারা চোখে আঁচল চাপা দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, এদ্দিন এক সাথে থাকার সেই মানুষগুলো চলে যাচ্ছেন সেই মেঘলা সকালে ।  সেইদিন সকালে তার একরত্তি ছেলেটিকে দেখেছিলাম, সবার চোখের আড়ালে , ওঁর ছেড়ে যাওয়া বাড়ির ছাদের শেওলা ঢাকা নরম  দেওয়ালের এক কোনে বসে ভাঙ্গা ইঁটের টুকরো দিয়ে কি যেন হিজিবিজি কাটছে । কৌতুহল বশত এগিয়ে গিয়ে দেখেছিলাম, ও লিখেছে ..”আমি আবার ফিরে আসব” । ফিরে আসার সজল ইচ্ছের ওপর বৃষ্টি হয়ে ঝরে পরার সেই বছর কুড়ি আগের  মেঘলা সকালটা বোধহয় এই শেষ  শ্রাবনের বিকেলে ফিরে এলো আবার । যে নির্বাসনে আমরা অনেকে আজীবন নির্বাসিত, সেই দ্বীপে মুখোমুখি দেখা হলো আমাদের..নিজেদের সাথে ।

Leave a Reply


Your email address will not be published. Required fields are marked *