Bengali Top

এই শহর জানে আমার প্রথম সবকিছু !

কলকাতা স্মৃতির শহর, কলকাতা একটা ‘হয়ে যাওয়া’, ফুরিয়ে যাওয়া, বিগতযৌবনা, জাস্ট পাস্ট হয়ে যাওয়া বড় বেদনার শহর।আমাদের জন্মাবধি চেনা, পুরোনো, মলিন এই শহরটাকে এভাবেই দেখতে আমরা অনেকেই অভ্যস্ত। কিন্তু সেই দেখার মধ্যে কতটুকু নিখাদ সত্যি ? তবে যে লোকে বলে, এই শহরের মধ্যে আছে নাকি অন্য একটা শহর ? কলকাতা কি আদৌ কল্লোলিনী তিলোত্তমা হয়েছে না এ আমাদের ভাতঘুমের দিবাস্বপ্নের অকর্মন্য খোয়াঁড়ি ছাড়া, কিস্যু নয় ? এই সব প্রশ্ন ওর নিজের অভিজ্ঞতায় জারিয়ে নিয়ে প্রাণ ঢেলে একটি লেখা লিখেছেন এক নবীন নাট্যকর্মী তুর্ণা আজকের আনন্দবাজার পত্রিকায়। সাতসকালে হোয়াটসঅ্যাপে লেখাটা পেলাম সুহৃদ বন্ধুর কাছ থেকে যিনি নিজেও নাট্যকর্মী। তার পরেই খালি খালিই মনে হচ্ছে, এই শহরটাকে ঘিরে ঠিক এই কথা, এই অভিজ্ঞতা তো আমারও, আমাদের মত আরও কতজনের। তাই এই লেখাটা তুর্ণার লেখার একটা এক্সটেনশন বলা যায়।
হ্যা, জানি শহরটা পুরনো হয়েছে। অসম্ভব দিন আনা, দিন খাওয়া একটা শহর। এর রাস্তায় রাস্তায় ধুলো, ধোঁয়া, দুষণে নাভিশ্বাস ওঠা ট্রাফিক, ঘন্টার পর ঘন্টা চড়া রোদে পুড়তে থাকা টিনগাড়ি বাস ট্রাম ! বিশ্বের মানচিত্রে কোনরকম আধুনিকতম, টিপটপ, সুখস্বাচ্ছন্দ্যের তকমা লাগানো ঝকঝকে শহরের সাথে এই শহরের তুলনাই হয়না।তবুও এই শহরটার না, একটা ম্যাজিক আছে ! সেই ম্যাজিকের ব্যাপারে দু চার কথা য্তটূকু বুঝেছি বলব !
যদিও কলকাতা বলতে অবিশ্যি অনেকে অনেক কিছু বোঝেন। যে যার মত দৃষ্টিতে দেখেন এই শহরটাকে। মুম্বাইফেরত ফিলিম পরিচালক কলকাতা বলতে বোঝেন উত্তর কলকাতার অলস অলিগলি আর শ্বেতপাথরের ডানাভাঙ্গা পরীর বাগান সাজানো ‘মার্বেল প্যালেস’ আর দুগ্গাপুজো। সেলিব্রিটি কন্দর্পকান্তি নায়ক নায়িকার কাছে কোলকাতা মানেই ‘মিষ্টি দই’ আর ‘মাছের ঝোল’। ‘বেওসাদার’ গুজরাটি ভাই , মারোয়ারী বোঝেন প্রায় জুরাসিক এজের ‘সাহেবী’ কেতায় বানানো ‘এলিট’ কেলাব-টেলাবের ফরেন লিকার আর শনিবাসরীয় আড্ডার মৌতাত। ফরেন থেকে আসা সাদা চামড়ার হেরিটেজ ট্যুর দর্শনার্থী বোঝেন মধ্য কলকাতার ক্যালেন্ডারে দাগানো ঘোড়দৌড়ের মাঠ, কুতুবমিনার, ভিক্টোরিয়া সিলমোহর স্বাক্ষরিত ‘মেমোরিয়াল’ সম্বল স্যুভেনীয়র। জোড়াসাঁকোর সত্তর পেরোনো ঘোষে’রা, বোসে’রা হাতে খবরের কাগজ আর ভাঁড়ে চা নিয়ে পাড়ার দোকানে বসে গুজগুজ করেন শহরটা গোল্লায় গ্যালো গিয়া, ‘ওরে ভাই, একদিন আমাদেরও আসিলো’। সুতরাং এই ছানি পড়া কতিপয় মনের স্মৃতিনিচয় তুলোট কাগজের পেডিগ্রী পরিচয়টুকু বাদ দিলে তিলোত্তমা কলকাতা পৃথক কোথায় ? এ শহরের নব্য ঝাঁ-চকচকে বিদেশী স্টাইলে গড়ে ওঠা ঔপনিবেশিক সেক্টর ফাইভের অফিসপাড়াগুলোর আরোপিত সম্ভ্রমটুকুকে বাদ দিলে, হালফিলের ঝল-মল ‘সাউথ সিটির’ কালো কাঁচে আগাপাশতলা ঢাকা বাতানুকুল রং রোশনাইটুকুকে বাদ দিলে যে দৈনন্দিন, রোজকেরে শহরটা পড়ে থাকে, সেই কোলকাতার খাঁটি জিনাল কোড ঠিক কতখানি পড়তে পারে আজকের প্রজন্ম ?
কোলকাতার আসলে একটা মন আছে। একটা বড্ড মন কেমন করা প্রাণ উচাটন করা মনের আকাশ আছে। মেনে নিচ্ছি, আমরা পিছিয়ে আছি। আমাদের শহরে উড়ালপুল ভেঙ্গে পড়ে দিনেদুপুরে, আমাদের শহরে গাড়ি চাপা পড়ে মানুষ মরে আখচার। রাজনৈতিক দলগুলোর ফাঁপা প্রতিশ্রুতিতে আর বিশ্বাস করে না কেউ। রোজকার মিথ্যাচার, স্বপ্নভঙ্গ, ঘুষে আর ঘুণে কুরে কুরে খেয়ে নেয় এখানকার খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জন্ম থেকে লালিত বিশ্বাসের দলিল। তবুও কলকাতার একটা অদ্ভূত স্পিরিট আছে। সারাদিন গাধার মত খেটে বাড়ি ফেরা দুটো পরিশ্রমী মানুষ এখনো মিনিবাসে বসে কবিতা পড়েন, স্বচক্ষে দেখেছি।কয়েক গেলাস লাল চা নিয়ে সস্তার এজমালি ক্লাবঘরে রিহার্সাল জমে, তাক থেকে ধুলো ঝেড়ে বাঙালির হাতে সঞ্চয়িতা নামে, নামেন রবীন্দ্রনাথ। ঘরে ঘরে দেয় ডাক, পঁচিশে বৈশাখ। এ কলকাতা গ্রুপ থিয়েটার করে। আজীবনের সঞ্চয় ভেঙ্গে, শুদ্ধু নতুন কিছু একটা করার স্বপ্নে মশাল জ্বালায়, হাত পোড়ায় বারবার ! তবুও পিছোয় না, ভেঙে পড়ে না, দমে যায় না। কারখানায় গনগনে আগুনের সামনে সারাদিন হাতুড়ি পেটানো দুটো হাতের কড়া পরা আঙ্গুলে, মাঝরাতের গিটারে বেজে ওঠে সুর, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’…. দমদমের ঘিঞ্জি এপার্টমেন্ট এর ছাদে। হয়ত আজও অফিসে মাইনে হয়নি, হয়ত কেনা হয়নি মায়ের অসুখের ওষুধ! রাতের খাওয়া জুটলো কিম্বা জুটলো না, তবুও এক আকাশ ভরা তারার নিচে এখনো অতল বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে, মাথাটা উঁচু করে দু-দন্ড বসে দেখতে জানে কলকাতা। ‘বিশ্বভরা প্রাণ’ শব্দ দুটো গাইলে কেন যে দু চোখ ছাপিয়ে টলটলে জল আসে, এই কলকাতা জানে। কতকাল চুনকাম হয়নি, এমন মনখারাপ পাড়াগুলোর আরও মনখারাপ বাড়িগুলোর খড়খড়ি দেওয়া জানলার ফাঁক থেকে সাতসকালে ভেসে আসে কচি গলায় ভৈরবীতে আলাপ,’ নি-তা উঠা সু-মা রা-না ‘, বেজে ওঠে হারমোনিয়াম। শুধুমাত্র মুড়িতে জল আর ছাতু ভিজিয়ে খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বাবা কাজে যান মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে। জেনে রাখুন আজ কিন্তু ওদের বাজার হয়নি, তবুও কি তৃপ্তি ওই সকালবেলার গানে, ওই চর্চাটুকুতে। হলফ করে বলতে পারি, এই কলকাতাকে আপনি এ দেশের অন্য কোথাও দেখেন নি, দেখেন নি এই বাঙালিকেও।
এই কলকাতা পড়ে, রাত জেগে পড়ে। নতুন, পুরোনো, সওব পড়ে। এমনকি মুদির দোকান ফেরত কাগজের ঠোঙাও পড়ে আদ্যপান্ত। কলেজ স্ট্রিটের পুরনো বইপাড়ার নিঃঝুম দুপুরের আলস্য থেকে ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে হন্যে হয়ে এখনো প্রিয়তম বইটি খুঁজে বেড়ান একলা পাঠক। কোথায়, কে জানে, ছেঁড়া পাতার জীর্ণ পোশাকে শুয়ে রয়েছেন কোনো না কোনো ছদ্মবেশী সম্রাট ! বিনয় মজুমদার, নিটশে, পাবলো নেরুদা থেকে বিভূতিভূষণ, চোখে ঘোর লেগে থাকে এ বাঙালীর। শুধু বিজ্ঞাপনের কফি হাউস নয়, লেখাপড়ার পিনাল কোড এই শহরের রাস্তায় রাস্তায়। এই লাজুক শহর লেখে নিভৃতে, গোপনে, সলাজে। তবু লেখে। ইশকুলের গন্ডি পেরোনো অঙ্কের সব খাতা জুড়ে, পিছনের পাতায় এ কলকাতা লেখে প্রেমের কবিতা, লেখে গান। হিসেবের বইয়ের উপরে উঠে আসেন পূর্ণেন্দু পত্রী। জিম মরিসনের গান থেকে দেবব্রত বিশ্বাসের প্রাণে এ কলকাতা মুখ ধোয়, বাজার যায়, দরদস্তুর করে শাকান্ন কেনে। বাবার কাছ থেকে পয়সা ধার করে লিটিল ব্যাগাজিন ছাপায় এ শহর। সে ম্যাগাজিন কেউ কেনে না, তবু তো নিজের, নিজেদের প্রথম লেখাগুলো ছাপার কালিতে দুই মলাটের মধ্যে ! আহা, সে বিস্ময় আর কে জানিল ! এ কলকাতা বড্ড আটপৌরে যেমন আবার ঠিক ততটাই আধুনিকও। কপালের দুই ভুরুর মাঝখানে, একটু ওপরে একটি ছোট কালো টিপ এঁকে যাদবপুর থেকে টালিগঞ্জে হলুদ সালওয়ার আর আকাশনীল ওড়না বিজয়কেতনের মত উড়িয়ে টিউশন পড়তে যায় এ কলকাতার বসন্তসেনানীরা। ব্যাচের সর্বাপেক্ষা ক্যাবলা, কোনো অ্যামবিশনলেস চশমা পড়া প্রেমিক প্রেমিক ছেলেটির প্রেমে আজো পড়ে এই কলকাতা। এস.এম.এসে কবিতা পাঠায় মেয়েটি, ব্যথার আঙ্গুল ছুঁয়ে যায় দুজন দুজনকে। ওদের কবিতা একসময়ে গান হয়ে ছড়িয়ে পড়ে উত্তর থেকে দক্ষিনে, রুখাসুখা বিষাদবাতাস হয়ে চৈত্র সেলের বাজারে পণ্য হয়ে ঘোরে হাতে হাতে। শহর বলে ওঠে কোরাসে ,’আহা, উত্তাপ কত সুন্দর, তুই থার্মমিটারে মাপলি!’
এই শহর এখনো বন্যাত্রাণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঝাঁপিয়ে পড়ে যেকোনো রকম অন্যায়ের বিরুদ্ধে ,গর্জে ওঠে সাম্যের জন্যে, সম্প্রীতির জন্যে। আকাশ মাথায় করে এগিয়ে চলে মানুষের মাথায় মাথায় শহর ছাপিয়ে যাওয়া মিছিল। কাগজে জড়ানো সাদা কৌটোয় একটু খানিক ফুটো করে খুচরো পয়সা সংগ্রহ করতে স্টেশনে স্টেশনে নেমে পড়েন মানুষ।না, আলাদা করে কারোর কোনো পরিচয়, বংশমর্যাদা থাকেনা সেখানে।” দাদা, নেপালের মানুষ বড় কষ্টে আছে, দাদা মায়ানমারে ভূমিকম্পে সব শেষ, দাদা, বাংলাদেশে ঘুর্নিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, মুক্তহস্তে দান করুন, যে যেরকম পারেন”। আকুল গলার ডাকে মধ্যবিত্ত মানুষ দাঁড়িয়ে যান, হৃদয়ে হৃদয়ে জ্বলে ওঠে দু চার টুকরো নিভে যাওয়া বিবেক, পকেট ঘেঁটে দু-চার পয়সা যে যা পারে, কৌটোয় গুঁজে দেয় এই কলকাতা। তখন বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এই কলকাতাই তো কর্পোরেট, এই কলকাতাতেই তো স্পন্সরড জৌলুসের ছটায় চোখ ধাঁধিয়ে যায় থার্টি ফাস্টের নিশিনিলয়ে মজলিশে। অবাক লাগে এই শহরই বিরাট কোহলির এক একটা ছক্কায় হাজার হাজার টাকার বাজি পোড়ায় মাঝরাতের বুক চিরে ! আসলে কলকাতা এমন একটা আবেগের নাম, এমন একটা জ্যান্ত প্রানের নাম, যে নাম যত পুড়বে ততই ফিনিক্স পাখির মত ছাই ঝেড়ে উঠে আসবে বিশ্বাসের অমোঘ দাওয়াইতে।
বাঙালি শুধু রোমান্টিক , বাঙালি শুধু আড্ডা মারে বলে যতই মুখ টিপে বাঁকা হাসি হাসুক পৃথিবী, এ রকম আড্ডা থেকে জন্ম নিয়েছে যত সাহিত্য, সঙ্গীত, প্রবন্ধ, সেরকম ভূভারতে আর কই? এই শহর প্রতিদিন আমায় যত বন্ধু উপহার দিয়েছে, তেমন অন্য কোনো শহর আর দিল কোথায় ? কর্মসুত্রে ঘুরে বেরিয়েছি এ দেশের অনেক অলিগলি। কিন্তু এমন কিছু সোজা সহজ বন্ধু তো অন্য কোথাও আর পাইনি,যাদের জন্যে সেই শহরকে আমি বারবার আভূমি প্রনাম করতে পারি ! আমার এক বন্ধুর মাসি ছিলেন। খুব কালো আর সেইজন্যেই হয়ত বা আজীবন বিয়ে হলনা তার, মনে পরছে তার কথা। ইশকুল ফেরত তার বাড়ি বুড়ি ছোঁয়া করে আমরা দুই বন্ধু ফিরতাম। গরমের দুপুরে রোজ দরজা খুলেই সেই মাসি আমাদের দেখে ভারী কষ্ট পেতেন আর বলতেন ,’ ইশ ! এতটা রাস্তা তেতেপুড়ে এলি, দাঁড়া ,আগে জল খা ‘ বলেই বয়াম থেকে মোটা মোটা গুড়ের লাল বাতাসা আর কাঁসার গেলাসে এক গেলাস ঠান্ডা জল দিতেন, রোওজ। আমার কাছে ওই মাসির নাম কলকাতা। আমার এক বন্ধু আছে, আমি পায়েস ভালোবাসি বলে যে, সেই কালিঘাট থেকে সল্টলেক অবধি পায়েস রেঁধে নিয়ে চলে এলো ভিড় মেট্রোয় চেপে, শুধু আমায় খাওয়াবে বলে! আমার কাছে সেই বন্ধুর নাম কলকাতা। আমার এক পিসি আছেন, আমার প্রথম সব লেখা যাকে না শুনিয়ে আমার শান্তি নেই এবং তাঁর প্রথম সব লেখা আমায় না শুনিয়ে তাঁরও শান্তি হয়না, আমার কাছে সেই মানুষটির নাম কলকাতা। সেই বন্ধুটি, যে নির্দ্বিধায় রাত তিনটের সময় ফোন করে ঘুম ভাঙিয়ে বলে, ‘ অ্যাই, তোর গলায় না ওই গানটা অনেকদিন শুনি নি, একটু প্লিজ ‘আজ জানে কি জিদ না করো..’ টা গাইবি ?’ আমার কাছে এই মানুষগুলোর নাম কলকাতাই তো !
এই মানুষগুলোর কারোর সাথে আলাপ রক্তসুত্রে আবার কারোর সাথে বাসে, ট্রামে , সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায়। অথচ কি আশ্চর্য, আমার জন্মদিনের ঠিক আগে আগে দেখা করে তারা উপহার দিয়ে গেছেন আমার সবচেয়ে ভালোলাগার মুহূর্তগুলো। কতবার খুঁজে দিয়েছেন প্রিয় গান, ভালোলাগা বই আর তাদের মুখে আমি দেখেছি এই শহরের মুখ।বিপ্লবে, বিদ্রোহে, কড়া রোদ্দুরে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়েছেন এরাই তো। ব্যক্তিগত পরাজয়ের দিনে, পাশে দাঁড়িয়ে এক ঠোঙা থেকে ভাগ করে খেয়েছি মান, অপমান, কষ্ট, যন্ত্রণা এদেরই সাথে, ভাগ করে নিয়েছি আনন্দসম্ভারও। কই ,কোনদিনও মনে হয়নি তো , কেন এদের সাথে মেশা টা প্রয়োজন ? কিসের লাভ, কার লাভ? আসলে ভাবুক বাঙালি, বেকুব বাঙালি এই লাভক্ষতির অঙ্কের হিসেব থেকে আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করে আজও। এক পয়সা ব্যবসা না হলেও তার চলবে,কিন্তু এক ছটাক হৃদয় কম পড়লে তার চলবে না। আর তাই এই ক্লান্ত, হতশ্রী, খারাপ দেখতে শহরটা আমার এখনো এত প্রিয়। কারণ সে মানবিক। তার একটা মানুষের মত মুখ আছে, দপদপানো একটা মাথা আছে। বুকের বাঁ দিকে ধক ধক করা একটা হৃদপিন্ড আছে। শহরটা দৈর্ঘে প্রস্থে হয়ত বদলেছে আজ , সেজে উঠেছে অন্যরকম ছাঁদে, কিন্তু আদপে কলকাতা আছে কলকাতাতেই।এই শহর আমার অনেক কিছু নিয়েছে যেমন দিয়েছেও ঢের। তেমন কিছুই তো করে উঠতে পারিনি জীবনে।গাড়ি বাড়ি করতে পারিনি কিছু। বাসে, ট্রেনে বাদুড় ঝোলা হয়েই অফিস কাছারী সারি। তবুও ওই যে ম্যাজিকের কথাটা বলছিলাম না লেখাটার শুরুতে, ঠিক ওই ম্যাজিকটাই এখনো আমায় এ শহর থেকে ক্লান্ত করেনি একটুও। তাই আমার কলকাতা ছেড়ে যাওয়া, আরো অনেক স্বাচ্ছন্দ্যের, বেমিসাল লাইফস্টাইলের খোঁজ পাওয়া, নামী কোম্পানির দামী গাড়ি চড়ে যাতায়াত করা উচ্চপদস্থ পিসতুতো ভাইটি যখন বলে,” কি করে কলকাতায় থাকিস তোরা ? ওই ঘামের গন্ধে হাজার হাজার লোকের ভিড়ে লোকাল ট্রেনে করে কমিয়ুট করিস, জাস্ট নেওয়া যায় না,”…কেন জানি না , খুব করুনা হয় তার জন্যে। এ শহরটাকে সে চিনতেই পারল না।
তুর্না’র কথাতেই বলি ,” আমার শহর, পচা শহর, গরমের শহর, ধুলোর শহর, অব্যবস্থার শহর, তবু আমার শহর। কলকাতা সংস্কৃতির শহর, মিছিলের শহর, আড্ডার শহর, প্রতিবাদের শহর, রাজনীতির শহর, প্রেমের শহর, উন্মাদনার শহর, আবেগের শহর, আবেশের শহর,এই জেটসেট মানসিকতার যুগেও অকারণ সময় নষ্ট করার শহর।” এই শহর কলকাতার ম্যাজিকটাকে দেখতে চান ? অনুভব করতে চান? সম্ভব হলে বৃষ্টির দুপুরে হারিয়ে যান চক্র রেলে চেপে আর নেমে যান বাগবাজার ঘাটের একটু আগে। খুঁজে পাবেন! মাঝরাতের সাদার্ন এভিনিউতে ট্রামলাইনের ওপর শুয়ে পরে কোনদিন কান পাতুন রাস্তায় মাথা রেখে, ঠিক শুনতে পাবেন এ শহরের হৃদস্পন্দন। ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ঝলমলানো রাস্তা দিয়ে পুরনো রেকর্ডের দোকানে গিয়ে অশীতিপর দোকানির কাছে গিয়ে দাঁড়ান দু-দন্ড , দেখতে পাবেন, এই শহরের ম্যাজিকটাকে !

FacebookTwitterGoogleLinkedIn


One comment

Leave a Reply


Your email address will not be published. Required fields are marked *