Bengali

আহা, আজি এ বসন্তে

FacebookTwitterGoogleLinkedIn


ফ্ল্যাটের পুবদিকের জানলাটা থেকে সূর্যের আলো বেশ মসৃন একখানা আলোর রাস্তা তৈরী করে ছড়িয়ে পরেছে খাটের পায়ের দিকটায়। অনেকটা রেশমের কুচির মতন চিকচিক করছে ধুলো, ওই আলোর রশ্মির মধ্যেখানটায়। ঘরদোর এলোমেলো ,লন্ডভন্ড। খাটের ওপর ইতস্তত নানা মাপের ইস্কুলের জামা, প্যান্ট ,ভেজা তোয়ালে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছত্তিরিশ। টেবিলের ওপর আধ-খাওয়া ম্যাগির প্লেটের ওপর অনেকক্ষণ থেকে একটা মাছি টার্গেট করে ভনভন করে উড়ছে । মোবাইলে বাজছে বিশু পাগলের গান, ” কে সে আমার স্বপনতরীর নেয়ে ? “…শম্ভু মিত্রের রক্তকরবী তুনীরের খুব প্রিয়। গিন্নি সকাল সকাল বাড়ি না থাকলেই সেদিন এইটা ও চালাবেই। ঝিনুক খুব রেগে যায়, বকবক করতেই থাকে ,”খালি একটাই নাটক তোমায় শুনতেই হবে হাজার বার, যত্তসব !” ছোটবেলায় বাড়িতে রবীন্দ্র রচনাবলী টলি ছিল, এ বাড়ি , ও বাড়ি শিফট করতে করতে সব গেছে । তাই এখন মোবাইলই ভরসা। একটা গোল্ড ফ্লেক কিংসাইজ ধরিয়ে তুনীর বালিশে আধশোয়া হয়ে শুয়ে , ঢুলু ঢুলু চোখে এক কাপ সোনালী লাল মকাইবাড়িতে চুমুক মারছে সুরুত সুরুত করে আর আড় চোখে মেপে নিচ্ছে ব্যালকনি থেকে সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছের মগডালে বসা কোকিলটাকে। ব্যাটাচ্ছেলে সকাল থেকে ডেকে ডেকে একেবারে গলা চিরে দিলে। সিগারেটের শেষ টানটা বুক ভরে নিয়ে কুতকুতে চোখে একটা প্রমান সাইজের রিং হাওয়ায় ছেড়ে তুনীর ভাবছিল, আহ, আজ অফিসটা যদি ডুব মারা যেত ! এমন একটা দিব্যি টোটাল বসন্ত দিন কি রোজ রোজ আসে রে ভাই! ছেলেকে বগলদাবা করে বউ গেছে ইস্কুলে। আজ ওদের ধ্বজাপুজো।…এই সেরেছে, মাথা থেকে রক্তকরবীর বীজ আর যাচ্ছে না দেকচি, আই মিন আজ ওদের সেকেন্ড টার্মের শেষ দিন।তবে হ্যাপা যা , তাতে ধ্বজাপুজো কথাটা খুব খারাপ যে বলেনি, সেটা মনে করে একা একাই ফিকফিক করে খানিক হেসে নিল তুনীর। হাজার হোক তুনীরের ছোটবেলায় তো আর ওসব ছিল না, পরীক্ষা বলতে ছিল হাফ ইয়ারলি আর মার্চ মাসের অ্যানুয়াল পরীক্ষা। আলুসেদ্ধ দিয়ে গরম ফ্যানভাত একটুকরো কাঁচা লঙ্কা দিয়ে হাপুস হুপুস করে মুখের মধ্যে চালান করে গজলক্ষী টেলার্সের প্লাস্টিকের প্যাকেটে খবর কাগজের মলাট দেওয়া কোণা ভাঙ্গা বোর্ড আর পেন পেন্সিল স্কেল নিয়ে রওয়ানা দিত ওরা ইস্কুলের দিকে। বেরোনোর সময়ে বাড়িশুদ্ধ লোককে পেন্নাম করে ঠাকুমার হাতের দইয়ের ফোঁটা কপালে লাগিয়ে দরজার ওপরে সরস্বতীর ক্যালেন্ডারের দিকে করুন চোখে তাকিয়ে নিয়ে বুক ঢিপ ঢিপ প্রনাম ঠুকেই, সাইকেল নিয়ে দে ছুট। সেসব পাস্ট আজ। আজকাল দুর্ধর্ষ দুশমন যেসব ইংরিজি কনভেন্টে খোকারা খুকুরা পড়াশোনা করে সেখেনে টার্ম আছে, ফাস্ট হোক, সেকেন্ড হোক, অ্যাসেসমেন্ট আছে, কিন্তু ওসব অসভ্যের মত হাফ ইয়ারলি, আনুয়ালির ইয়ার্কি নেই।কালকেও যথারীতি বাড়ি ফিরে রাত্তির নটার সময়েও মিরাক্কেল ছেড়েই ব্যাজার মুখে তুনীর বসেছে পাবলোর জি.কে.টা নিয়ে। রান্নাঘর থেকে পাস্তাতে সস ঢালতে ঢালতে তখনও ঝিনুক চিল্লিয়ে যাচ্ছিল,” বুঝলে না তো কিছু, ছেলে গোল্লায় গেলে তারপর বুঝবে ! সবার বাবারা দিনরাত পড়াচ্ছে, এসব কনভেন্ট থেকে কম মার্কস পেলে ওরা দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয় ! ক্লাস টু’তে আর উঠতে হবে না ছেলেকে ! সেসব চিন্তা আছে ? অসভ্য লোক কোথাকার ! সারাদিন অফিস আর কেউ করে না, আত্রেয়র বাবাকে দ্যাখো, সুস্মিতার বরকে দেখে শেখো……”.ঝনঝন, কনকন, ভনভন, ইত্যাদি, ইত্যাদি। ..হাজার হাজার ক্যাকফনির মাঝে পাবলোর জি.কে শিকেয় উঠলো আর তুনীর রনে ভঙ্গ ! পারলে সারারাত পাবলোকে পড়াত ঝিনুক ! ভোর হতে না হতেই নড়া ধরে ঘুমন্ত ছেলেটাকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে এগ্জাম দেওয়াতে। তবে রক্ষে এইযে, গল্পটা আজ এখানেই শেষ। ক্লাস টুতে ছেলে উঠুক না উঠুক, তুনীর আজ বুক ভরে নিশ্বাস নেবে।ওর পরীক্ষা শেষ আজ।
চায়ের কাপটা ছেড়ে খবরের কাগজটা টানতে গিয়ে চোখে পড়ল খাটের মাথার কাছে রাখা সাইডটেবলে ঝিনুক আর ওর একসাথে ছবিটা। পাবলো তখন একরত্তি, বছর দুয়েক। ডোরাকাটা অ্যানিম্যাল প্রিন্টের সোয়েটার পরা তুলোর পুতুলের মতন ছেলেটাকে কোলে নিয়ে তুনীর, এক হাতে ব্যাগপত্তর, কাঁধে জলের বোতল আর মহারানীর মত পোজ দিয়ে চোখে একটা আর মাথার ওপরে আরো একটা সানগ্লাস চাপিয়ে ফুরফুরে সমুদ্র নীল শিফন পরে ঝিনুক। দিব্য ছবিটা। পাবলো হওয়ার পরের বছর সিকিমে তোলা। ব্যাকগ্রাউন্ডে ওই কি জানি নাম, ভুলে গেছি , বুদ্ধিস্ট মনেস্ট্রিটা। দিনগুলো কি দ্রুতই যে কেটে গেল। ঝিনুকের সাথে ওর দাম্পত্যটাও কি রকম যেন বদলে গেল। পাবলো আসার পর ঝিনুক, শুধুই পাবলোর মা আর তুনীর পাবলোর বাবা।ঠিক আর পাঁচজন মা যেমন হয় ; আর পাঁচজন বাবাকে শাপশাপান্ত করতে করতে, পাঁউরুটিতে মাখন লাগাতে লাগাতে আর দড়ি তে কাপড় মেলতে মেলতে যেমন দিন কাটে, ঠিক সেইরকম। অথচ , বসন্ত একদিন আমাদের ও আসিলো রে ভাই! সেই বিয়ের পরদিন দমদমের পুরনো বাড়ির দেড়তলার মেজানিন ফ্লোরের যে ঘরটায় বরাদ্দ হয়েছিল ওদের থাকার ব্যবস্থা, সেখানে ঢুকে ঝিনুকের সে কি কান্না। চন্দন টন্ডন ঘেঁটে নাকের ডগায় চশমাটা সেট করতে করতে ফোঁপাতে ফোঁপাতে ঝিনুকের সেই কান্না দেখে তুনীর তো কিংকর্তব্যবিমুড়। আসলে, বাপ মা মরা ছেলে তো ! সেদিন বুঝতেই পারেনি, ঠিক কি করলে ওর নতুন বউটি একটু ঠান্ডা হবে, শান্তি পাবে ইত্যাদি ইত্যাদি ভাবনায় সে একেবারে দিশেহারা অবস্থা। আসলে বিয়ের পর পর যা হয় আর কি , একে অনভিজ্ঞ , তার ওপর একটা গোটা মেয়েমানুষ আমার সঙ্গে থাকবে এই কথাটা ভাবলেই কেমন হাত পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যায়। ব্যাচেলর জীবন একরকম । এখন সব্বখন ছমছম, ঝমঝম, ঠুং ঠাং চুড়ির আওয়াজ আর ঘর জুড়ে কেমন জানি একটা ছমছমে মিষ্টি গন্ধ চলে ফিরে বেড়াবে । মা’য়ের চলে যাওয়ার পর ওই গন্ধটা আর কোনদিনও পেতোনা তুনীর। তাই বিয়ের পরের কটা দিন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন ব্যাপার স্যাপার। বাথরুমে ঢুকলেই চোখে পরত আয়নার গায়ে লাগানো সবুজ টিপ আর স্নানঘর জুড়ে কি একটা নাম না জানা শ্যাম্পু আর সাবানের মন কেমন করা একটা ফুরফুরে গন্ধ। ঝিনুক স্নান সেরে বেরোতো আর তুনীর বই ফাঁক করে আড় চোখে মেপে নিত একটু একটু করে ওর সুন্দরী বউটিকে।ঘাড় থেকে আলগোছে জড়ানো আধভেজা চুলে তখনও লেগে থাকা ফোঁটা ফোঁটা জল, আর সিঁথি থেকে ধুয়ে যাওয়া লালচে সিঁদুর ছড়িয়ে পরা কপালে ঝিনুককে যেন আরো সুন্দর করে দিত। শাড়িটা কোনক্রমে জড়িয়ে নিয়েই ঝিনুক রাগী চোখে তাকাত তুনিরের দিকে আর তুনীরের চোখ সঙ্গে সঙ্গে বইয়ের পাতায়, ভিজে বেড়ালটি । যেন, কত ভালো ছেলে। ভাজা মাছ উল্টে খেতে উনি মোটেও শেখেননি ! এই সাইলেন্ট খেলাটা চলেছিল অনেকদিন, পাবলো হয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর অবধিও। তখন ও জীবনে বসন্ত ছিল। তারপরে কবে জানি সব ফিকে হয়ে গেল। শুধুই মেমোরিজ ইন মার্চ !
আসলে জীবনে প্রায়োরিটি অনেককিছু বদলে দেয়। পাবলোর বড় হওয়া, স্কুল, অ্যাডমিশন, নতুন ফ্ল্যাট কেনা, ব্যাঙ্কের লোন, দমদমের বাড়ি ছেড়ে শিফট করা, অনেকগুলো জরুরি কাজের ভিড়ে অনেকগুলো বছর জাস্ট জলের মতন ভেসে গেল, তাই সম্পর্কের অ্যালবামের পুরনো ছবির মতই রংগুলো যেন অনেকটা ফিকে লাগছিল আজ। কলিং বেলের আওয়াজে সম্বিত ফিরল তুনীরের । রান্নার মাসি চলে এসেছে । ওরেব্বাবা, তার মানে সাড়ে নটা বেজে গেছে। আজ কপালে দুঃখ আছে।দরজাটা খুলে দিয়েই ঝিনুকের পাখি পড়া শেখানো বুলির মত তুনীর বলে গ্যালো, ফ্রিজে কালকের ভেন্ডি কাটা আছে, ওগুলো দিয়ে চচ্চরী হবে, পোনা মাছটা একটু ভিনিগার দিয়ে বরফ ছাড়িয়ে সর্ষে দিয়ে কোরো আর মুসুর ডাল আছেই আগের দিনের, গরম করে দিও। লাফ দিয়ে বাথরুমে ঢুকতেই শুনতে পেল তুনীর, মোবাইল ঝনঝন করে বাজছে।ধুস, বাজুক গে। হবে ওই রাতুলের বাচ্ছা ! রোজ বেরোনোর আগে ফোন মারবেই একটা,’ গাড়ি নিয়ে দাঁড়াচ্ছি আজ বাইপাস হয়ে যাব।চলে আয়’। ও ফোন না ধরলেও চলবে।স্নান সেরে , শেভিং সেরে থুতনিতে আফটার সেভ লাগাতে লাগাতে বেশ ফুরফুরে মেজাজে তুনীর বেড রুমের আলমারিটা খুললো।হালকা নীল শার্ট আর কালো ট্রাউসারটা বের করে গলিয়ে নিল অঙ্গে। চুলে চিরুনি চালাতে চালাতেই, ফোন আবার ঝনঝন। খাওয়ার ঘরের টেবিলের ওপর থেকে লগ্নজিতা সামনের গাছের কোকিলটার মতই থেমে থেমে গেয়েই যাচ্ছে, ” থাক তব ভুবনের ধুলি মাখা চরণে, মাথা নত করে রব, বসন্ত এসে গেছে, বসন্ত এসে গেছে।” আরে, ছাতার মাথা বসন্ত এসছে তো হয়েছেটা কি ? তুনীরের জীবনে আর কিই বা এলো গেল ? নিজের মনে মনেই ওই গলাটার সাথে ঝিনুকের মাথা নত করা মুখ আর ছলছলে চোখের একটা কোলাজ বানিয়ে নিয়ে , তুনিরের বেশ ফুর্তি হলো খানিক। তারপরেই ফোঁস করে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে নিজের মনেই বলল,” থাক, দিবাস্বপ্ন দেখে আর লাভ কি বে” ! ড্রয়ারটা টেনে পার্সটা নিতে গিয়েই চক্ষুস্থির। একি !! ড্রয়ারের মধ্যে সযত্নে রাখা, এক গোছা টাটকা গোলাপ ফুল, তুনীরের প্রিয় সবুজ রঙের টাই আর বিশ্বভারতীর ছাপ দেওয়া রক্তকরবী একপিস। সঙ্গে ছোট একটা হাতচিঠি। লন্ড্রির স্লিপের পিছনে ঝিনুকের হাতের লেখা সবুজ কালিতে, লিখেছে .. ..” যক্ষপুরীতে ঢুকে অবধি এতকাল মনে হত ,জীবন হতে আমার আকাশখানা হারিয়ে ফেলেছি । এমন সময় তুমি এসে আমার মুখের দিকে এমন করে চাইলে,আমি বুঝতে পারলাম আমার মধ্যে এখনো আলো দেখা যাচ্ছে। কেবল তোমার আমার মাঝখানেতেই একখানা আকাশ বেঁচে আছে। ” – ইতি, তোমার ঝিনুক। জানি, নন্দিনী হতে পারলাম না তবুও আজ যে চৌঠা মার্চ , সেটা তুমি ভুলতে পারো, আমি পারি না। রক্তকরবী খুঁজে পেলাম না, তাই তোমায় গোলাপই দিলাম নাহয়। সঙ্গে তোমার প্রিয় নন্দিনী’কেও।বিকেলে তাড়াতাড়ি ফিরো, চিলি চিকেন বানাবো। শুভ বিবাহবার্ষিকী ! চিঠিটা শেষ করেই মোবাইলে তুনীর দেখল চারটে মিসড কল। হম, ঝিনুকই। পাবলোর স্কুল থেকেই বার চারেক ফোন করেছে বেচারী। তাড়াতাড়ি কল করলো ,ঝিনুককে । ফোনটা ধরেই খুব মিষ্টি গলায় ঝিনুক বলল,” পাবলোর স্কুলের কম্পাউন্ডে একটা রক্তকরবী গাছ পেয়েছি , জানো তো ! ফেরার সময় নিয়ে আসব । জলদি ফিরো প্লিজ।” একটু লজ্জা লজ্জা, একটু ধরা ধরা গলায় সেই দমদমের বাড়ির বিয়ের পরদিনের ঝিনুকের মত, মিটমিটিয়ে হাসতে হাসতে তুনীর শুধু এটুকুই বলতে পারলো, ” তাড়াতাড়ি ফিরবো।”সকালটা জাস্ট বসন্ত হয়ে গ্যালো।

One comment

Leave a Reply


Your email address will not be published. Required fields are marked *