Bengali Uncategorized

আমি অপার হয়ে বসে আছি ~

“নদী আমাদের কাছে ঠিক কেমন ছিল জানিস ? মায়ের মত । আমার তো মা ছিল না ।” এই পর্যন্ত বলেই হঠাত কেমন উদাস হয়ে,কাঁসার বাটি থেকে এক গাল মুড়ি নিয়ে চিবোতে শুরু করতেন আমার মাতামহ ।ওঁর এতক্ষণ ধরে বলে চলা নদীর গল্পের আঁকাবাঁকা চলনের রুপোলি খেইগুলো হারিয়ে যেত হঠাৎ| জানলার বাইরে কুয়াশা কুয়াশা কাদা ছাড়িয়ে, পানাপুকুর ছাড়িয়ে, সন্তুদের বাঁশবাগান ছাড়িয়ে, গঞ্জের বাজার ছাড়িয়ে , এমনকি দুরে রেল লাইনে থমকে থাকা কলকাতামুখো ট্রেন ছাড়িয়ে, মাতামহের দৃষ্টি স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকত । আমিও অপলক তাকিয়ে থাকতাম ওঁর মুখের দিকে আর সেই নীরবতাটুকুকে বাঙ্ময় করে একসময় ট্রেনের বাঁশির আওয়াজ তীব্র হয়ে বাজত । ওঁর চোখের কোন ভরে উঠত টলটলে জলে , আমি মনে মনে বেশ দেখতে পেতাম, খুব সকালের গাড় কুয়াশা ঘন হয়ে থমকে আছে পদ্মার বুকের ওপর। জেলেনৌকাগুলি দাঁড় টেনে টেনে জাল গুটোচ্ছে পাড় ধরে ধরে । আর বছর চোদ্দ পনেরর একটি কিশোর মাথায় বইপত্তর তুলে, ইস্কুলের জামাকাপড় পোঁটলা পাকিয়ে , কোমরে গামছা জড়িয়ে বুকজল ঠেলে ঠেলে উজান স্রোতে এগিয়ে চলেছে নদীর ওপারে । নদী পেরিয়ে প্রায় ৩ কিলোমিটার হাঁটলে তবে সে পৌঁছবে তার সদর ইস্কুলে । মাতামহর কাছে তার ফেলে আসা ফরিদপুরের শৈশবের ওই হাঁটুজল পেরোনো পাঠশালে যাওয়া মরাস্রোতের নদী, সাঁতার দিয়ে পেরোনো জেদ চিরে চিরে যাওয়া ইস্কুলের নদী, ঝড়ঝঞ্ঝার ফোঁসফোঁসানি যৌবনের নদীর এত রূপ শুনতে শুনতে কখন যে পদ্মাকে মনে মনে চিনে ফেলেছি হাতের পাতার মত, বুঝিনি । বুঝলাম, যেদিন বড় হলাম খানিকটা , নিজেও স্কুলে ভর্তি হলাম , আর প্রথমবার গঙ্গা দেখলাম ।
বছর ছয় -সাত বয়স হবে, যখন বড় ইস্কুলে ভর্তি হই। সে ইস্কুলের বিরাট ফিকে গোলাপী রঙের স্কুলবাড়ির প্রধান বিশেষত্ব ছিল, তার বিরাট বিরাট জানলা দিয়ে ক্লাসরুমের ঠিক পাশ দিয়েই দেখা যেত, আদিগন্ত স্লথ গতিতে বয়ে চলা স্লেট রঙের ভাগীরথী ।ভাগীরথী নামটা অবিশ্যি ভূগোল বইতে পড়া, জ্যাঠা মশাই বলতেন ‘পতিতপাবনী গঙ্গে’ আর ঠাকুমা গঙ্গাস্নানে যাওয়ার নাম শুনলেই হাতজোড় করে মাথায় ঠেকিয়ে স্মিত হেসে বড় বড় প্লাস্টিকের জেরিকেন ,কৌটো নিয়ে প্রস্তুত হতেন, গঙ্গাজল বাড়িতে নিয়ে আসবেন বলে । আমার কাছে যদিও এ নদী , নদীই ছিল । তাকে আমি মনে মনে জানতাম গঙ্গা বলে, তবে তাকেই আবার পদ্মা, যমুনা বা গোদাবরী ভেবে নিতেও আমার কোনো আপত্তি ছিল না । তখন মনে হত, এ তো সেই গল্পে শোনা নদী । একই রকম । এমনটাই তো । তবে মাতামহ যে বলতেন, সে আলাদা দেশ ! আলাদা মুলুক ! তখন বুঝিনি, এখন বুঝি। নদীর কোনো দেশ হয় না । যুগযুগান্তের গন্তব্যহীনতার ওপর দিয়ে , সমস্ত অর্থ, অনর্থ, ধর্ম, অধর্মের ওপর দিয়ে, সব দিকচিন্হ মুছে দিয়ে বয়ে চলাটাই তার ধর্ম ।
“কে কাকে প্রশয় দেয় ? নৌকা নাকি ধাবমান স্রোত ?
নৌকা কি গন্তব্য চেনে ? চেনে নাকি চির- প্রান্তদেশ ?
স্রোতও চিনেছে শেষ ? জেগে গেছে চির নির্বাপণ ?
নৌকা ও স্রোত আসলে এক অন্যের উপনিবেশ ।
মা জল । মা সেই স্রোত । ভেসে আছি গর্ভবাসকালে ।
কে কাকে চেনাবে আলো, অন্তিম অন্ধকার ফুরালে ?” (রেহান)
উপরের কবিতাটি নদীর কথা বলে ।আবার বলতে বলতে শেষে এসে মায়ের কথা বলে, স্রোতের কথা বলতে বলতে গর্ভে ফিরে যায় । ঠিক সেইটাই কারণ এই কবিতাটি আরেকবার ফিরে পড়ার । পৃথিবীর যে কোনো দেশের, যে কোনো নদীর মধ্যে এক একজন মা বাস করে, যেমন মাতামহ বলতেন । আর মায়ের সাথে সম্ম্পর্কটা ঠিক যেমন , তেমনিই নদীর পাশে এসে বসার অভিজ্ঞতাটুকু । মনের ভেতর মহলের যত কষ্ট, অপমান, আশংকা, যন্ত্রণা, যা আর কাউকে বলা যায় না, জলকে বলা যায় । জলের কাছে এলে, নদীর কাছে এলে, মানুষ হালকা হয়ে যায় । জমাট বাঁধা দুঃখগুলো এক সময় নোনা হাওয়ায় হলদে বালির মত ঝুরঝুর করে উড়ে যায় মোহনার দিকে । ঠিক কখন যে বয়ে আনা কষ্টের বোঝাটা হালকা হয়ে গেল, তা বোঝার আগেই আমরা আরো একবার জীবনের কাছে রেকাবি পাতি , আরো একদান খেলা হোক । ইস্কুলের বাংলা পরীক্ষার ‘ভারত একটি নদীমাতৃক দেশ’ ইত্যাদি রচনা কমন পরতো , সেখানে যে দু চার কথা সাজিয়ে গুছিয়ে মুখস্ত করে লিখতাম , আর রোজকার চেনা নদীর সাথে যে জীবন, সেটা কিন্তু মিলত না । এ কথা বুঝিয়ে বলতে বললে কি বোঝাব জানি না , যেখানে নদীর বয়ে চলার নিরবিচ্ছিন্ন সত্যিটুকু আমার অস্তিত্বের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে , সেখানে তার গভীরতার আন্দাজ কি আদৌ দেওয়া যায় ? জীবন যেভাবে বয়ে যায় নদীর বয়ে চলাটুকুও ঠিক তেমনি সমান্তরাল এক জীবন ! হয়ত বা , নদী ছাড়া আমার ব্যক্তিগত জীবনটা প্রায় অর্ধেক জীবনও। জানিনা । আসলে সব জিনিস জানা যায় না, জানলেও বোঝানো যায় না, বোঝানোর প্রয়োজনও অনুভব করি না, শুধুই অনুভব করতে পারি ।
“মনে হয় যে নদীকে চিনি, সেও ঠিক নদী নয় ,আভাসে ইঙ্গিতে কিছু জল ” – আল মাহমুদ
আমার জন্মের আগে মা স্বপ্ন দেখেছিল , গঙ্গার ঘাটের শেষ সিঁড়িটিতে বসে একটি শিশু খেলা করছে আর মা কাছে যেতেই সে খিলখিল করে হেসে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে ফল, ফুল । স্বপ্নের শিশুটি আমি ছিলাম কিনা জানি না, তবে নদীর ইঙ্গিতটুকু ছিল, চেতনার মধ্যে মিশে বরাবর । তাই গর্ভের অন্ধকার থেকেই বোধহয় দাঁড় টানার আওয়াজ শুনে অভ্যস্ত ছিল কান । ক্লাসরুম যখন টিফিনের পরের ঘন্টায় ঘুম ঘুম হয়ে উঠত, পাটিগণিত ছেড়ে তাকিয়ে থাকতাম নদীর দিকে । কি জানি মনে হত, জটিল সমীকরণে ভরা ব্ল্যাক বোর্ডের চেয়ে অনেক বড় একটা সত্যি আছে নদীর বয়ে চলায় ।অনেক সত্যের মাঝে একটা ছিল মৃত্যু | মৃত্যুর চেয়ে বড় সত্যি আর কি বা হতে পারে ?একদিন মনে আছে ক্লাস চলছে তখন,, হঠাত হইহই শুনে গঙ্গার ধারের আলসেতে ঝুঁকে পড়েছে সক্কলে, ভিড় ঠেলে দেখেছিলাম, জোয়ারের স্রোতে কচুরিপানার স্তুপ আর ঘাসের ভেসে যাওয়া বড় বড় চাপড়ার সাথে আটকে রয়েছে একটা মানুষ ,একটা গোটা মানুষের দেহ । প্রায় দিন দুই ধরে ভেসে আসা সেই নিথর, নিস্পন্দ দেহটা পচে জলে সাদা হয়ে গিয়েছিল । তার সেই শক্ত দুটো মুঠো করে ধরে থাকা হাত আর খোলা দুটো চোখের পাতা ,জলের ওপর দিয়ে আঙ্গুল উঁচিয়ে তাকিয়ে ছিল আমাদের দিকে, অনেকক্ষণ । ঘুমোতে পারিনি কয়েকটা রাত । মৃত্যু যে কি ভয়ংকর শক্ত হয়ে জীবনকে শাসাতে পারে, নদীই দেখিয়েছিল প্রথম । আবার সেই নদীই তো ফিরিয়ে এনেছিল জীবনের সুধাও । রবীন্দ্রসদনের পিছনের গেটে ঢোকার মুখে যে একচিলতে বাগান, সেখানে এক ফাল্গুন বিকেলে একসাথে বসে ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে আনমনে একটি মেয়ে বলেছিল,’ আপনার কাছে এলে কেমন মনে হয় জানেন ?’ জিগ্গেস করেছিলাম, কেমন ? তাঁর বড় বড় ভাসা ভাসা চোখটিকে অনেকদুর শীতলপাটির মত বিছিয়ে দিয়ে সে বলেছিল,’ মনে হয়, বড় কোনো নদীর ধারে এসে বসলাম । জলকে যে সব বলা যায় । আপনিও ওই জলেরই মত ।’ তাঁর পরের দিনই মেয়েটির ট্রান্সফার হয়ে যায় উত্তর বঙ্গে আর বলা বাহুল্য তাঁর সাথে আর দেখা হয়নি আমার কোনদিনও । কিন্তু জলের সাথে সেই অন্ত্যমিল টুকু আমার এ জীবনের অনেকটা বড় পাওনা ।
প্রথম যেদিন মা বলেছিল উপার্জন করতে না পারলে আর ঘরে ফিরিস না , সেকথা প্রথম শুনেছে আমার নদী । প্রথম যেদিন বৃষ্টির অন্ধকার বিকেলে, ঘাটের পৈঠায় বাঁধা ফাঁকা নৌকার গলুইতে বসে একটি মানুষের শরীর চিনলাম , চকমকি পাথর ঠুকে আগুন জ্বালানো শিখলাম , চোখ মেলে দেখল , প্রিয় নদী । এক দিনের জ্বরে হার্টের অসুখে যখন বাবা ছেড়ে চলে গেলেন , তখনও সাথে ছিল নদী । রাত্রির কালো জল ঠেলে ঠেলে হাতের মধ্যে গঙ্গা মাটির পিন্ড আর তাতে গনগনে চিতা থেকে খুঁজে নেওয়া আমার জন্মদাতা পিতার নাভি, অস্থিটুকু নিয়ে যখন বিসর্জন দিলাম, নদীর গহ্বরে, তখন কোথাও কি একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো ? কে জানে । কলেজ ছুটির পরে নদীর ওপর ঝুঁকে পড়া একটা বটগাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতাম অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে আর যতক্ষণ না দিনের শেষ আলোটুকু নিভে মরচে পরে আসে , ততক্ষণ জলের সাথে কথা চলতো অনর্গল । বন্ধু ছিল অনেক, সাইকেল নিয়ে তারা চলে গেলেও , আমার মনে হত এই একটি নিজের জায়গা আছে, যার কাছে বসলে দু দন্ড শান্তি পাওয়া যায় । মনে হত নদী যেমন বোঝে আমায়, তেমন করে আর কেউ বোধহয় বোঝে না । তাই টিউশনের ক্লাস কাটা বিকেল, পদ্য লেখা গরিবের ঘোড়া রোগের বিকেল , রাত কালোতে সব হারানোর অস্থিরতার বিকেল সবেরই আশ্রয় ছিল নদী, প্রিয় নদী । আমার আলো-আঁধারী মফস্বলের নুয়ে পড়া কষ্টদুপুরগুলো, সাদা পাতায় লিখে একটা একটা করে ছিঁড়ে ভাসিয়ে দিয়েছি নদীর শরীরে কতবার । মনখারাপের এক একটা হলদে নেশার করাত কেটে কেটে ধোঁয়া করে উড়িয়েছি নদীর বুকেই। সেসবের সাক্ষ্য এখন বোধহয় পলি চাপা পরে গেছে । কিন্তু পলি সরলেই দেখা যাবে আমাদের শৈশবের উপন্যাস ,কেমন নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে নদীগর্ভে |
‘এই জীবনে এই সুখ হলো, আবার কোথায় যাই না জানি ,
আমি পেয়েছি এক ভাঙ্গা তরী, জনম গেল ছেঁচতে পানি,
আবার কোথায় , যাই না জানি ।’ – লালন
এখন অফিস আসি, নদী পেরিয়ে রোজ । গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত, শরতে নদীর আলাদা আলাদা রূপ দেখি । আলাদা আলাদা রং দেখি । এখন বুঝি, নদী বদলায় না কাউকে, শুধু বদলে যায় নিজে। আরো স্নেহ নিয়ে, মায়া নিয়ে, আপন করে নিয়ে নিজেকে সকলের জন্যে সাজিয়ে নেয় রোজ | বয়ে চলে যায় দিকশুন্যপুরের দিকে, গন্তব্যহীন গন্তব্যের দিকে। সেই বদলটা টের পাই , কারণ বদলেছি আমিও অনেকটা । সেই অনিশ্চিত , আজ জুটেছে, কাল কি হবে ? কালের ঘরে শনি’র সেই আধখানা মানুষটা বদলে গেছে । এখন সংসারের কথা ভাবি , গেরস্থের মত । ঠিক সময়ে দফতরে যাই, ফিরি । শুধু যাতায়াতের পথে আমায় লক্ষ্য রাখে আমার পুরনো বন্ধুটি । আমার নদীর বুক চিরে আমার অতীতের ফেরি বয়ে যায়, ভবিষ্যতের দিকে ।ছলাত করে পাড়ের ঢেউ গুলো জিগ্গেস করে ফিকে হেসে, কি হে ? কি বুঝছ জীবনটা ? আর আমি কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই জোয়ারের জলে ভেসে যায় আমার আজীবনের সংস্কার , উত্তর থেকে দক্ষিনের দিকে বয়ে চলে রুপোর পাতের মত ঝকঝকে শানিত তলোয়ার । আমি নৌকোর ছায়া থেকে ভীতুর মত তাকিয়ে থাকি সেই রুদ্র রূপের দিকে । কোজাগরীর চাঁদ ওঠে যখন নিঃশব্দে নদীর বুকে , মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি এই অপার্থিব দৃশ্যের দিকে । কথা থেমে যায়, শব্দ ঝরে যায় , শুধু রুপোর পাতের মত অলক্ষ্যে বেজে চলে সারেঙ্গীর সুর । আবার ভাঁটার টানে ভেসে আসতে দেখি খড়, বাঁশে আঁটা প্রতিমার কাঠামো , ভাসান বেলায় যার সাথে পাশাপাশি ভেসে চলে মৃত কুকুরের পেটফোলা দেহ। বর্ষার কালো মেঘের ছায়া যখন ঘন হয়ে, ভিড় করে আসে জলের বুকে , বৃষ্টি আসার আগের মুহুর্তে ফিসফিসিয়ে কানের কাছে লোভ দেখায় গাঙের হাওয়া, বলে ঝাঁপ দে, ঝাঁপিয়ে পড় । জীবনটাকে স্রোতের বিপরীতে সরীসৃপের মত এঁকেবেঁকে কাটিয়ে বেরিয়ে যা । মধ্যবিত্ত পা দুটো আঁকড়ে থাকে নৌকোর পাটাতন আর আমিও বুড়ো মাঝির মত মেপে নিই জল, দেখি চোখের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে একলা নির্ভীক একপাটি হাওয়াই চটি, হু হু করে ।
“আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়।। পারে লয়ে যাও আমায়। আমি একা রইলাম ঘাটে ভানু সে বসিলো পাটে, তোমা বিনে ঘোর সংকটে না দেখি উপায়।। নাই আমার ভজন সাধন চিরদিন কুপথে গমন। নাম শুনেছি পতিত পাবন তাইতে দেই দোহাই।। অগতির না দিলে গতি ঐ নামে রবে অখ্যাতি লালন কয় অকুলের পতি কে বলবে তোমায়।।

FacebookTwitterGoogleLinkedIn


Leave a Reply


Your email address will not be published. Required fields are marked *